
ওয়াশিংটন–নয়াদিল্লি: কড়া শুল্ক, বাণিজ্য বাধা আর রাজনৈতিক চাপ—সব কিছুকে কার্যত উপেক্ষা করেই আমেরিকার বাজারে রফতানিতে চমক দিল ভারত (India US export)। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে আমেরিকায় ভারতের পণ্য রফতানি আগের বছরের তুলনায় বেড়েছে ২২.৬ শতাংশ। মোট রফতানির অঙ্ক দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মহলে এই সাফল্যকে অনেকেই কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে ‘বড় ধাক্কা’ হিসেবেই দেখছেন আমেরিকার সাম্প্রতিক শুল্কনীতির বিরুদ্ধে।
এই পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে ভারতের Ministry of Commerce and Industry। মন্ত্রকের আধিকারিকদের মতে, আমেরিকায় চাহিদা স্থিতিশীল থাকা, ভারতীয় পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক দাম এবং বিকল্প বাজার হিসেবে ভারতের গুরুত্ব বাড়াই এই বৃদ্ধির মূল কারণ। বিশেষ করে ইঞ্জিনিয়ারিং গুডস, ফার্মাসিউটিক্যালস, টেক্সটাইল, রত্ন ও অলঙ্কার এবং আইটি–হার্ডওয়্যার ক্ষেত্রে রফতানি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
এই সাফল্যের প্রেক্ষাপট আরও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ ২০২৫ সালের অগস্ট মাসে আমেরিকা ভারতের পণ্যের উপর ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক চাপিয়েছিল। এর মধ্যে ২৫ শতাংশ ‘রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ’ এবং অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ জরিমানা শুল্ক আরোপ করা হয়েছিল রাশিয়া থেকে ভারতের তেল আমদানিকে কেন্দ্র করে। সেই সময় অনেক অর্থনীতিবিদই আশঙ্কা করেছিলেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে ভারত–আমেরিকা বাণিজ্যে বড়সড় ধাক্কা লাগবে এবং রফতানি কমে যাবে।
কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল উল্টো ছবি। স্বল্পমেয়াদে অন্তত ভারতীয় রফতানিতে বড় কোনও নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি। বরং বহু মার্কিন আমদানিকারক উচ্চ শুল্ক সত্ত্বেও ভারতীয় পণ্য কেনা চালিয়ে গেছেন। কারণ হিসেবে উঠে আসছে দু’টি বিষয়—এক, চিনের উপর নির্ভরতা কমাতে আমেরিকার সংস্থাগুলি বিকল্প উৎস খুঁজছে; দুই, গুণমান ও নির্ভরযোগ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে ভারত ইতিমধ্যেই শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে।
বাণিজ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রবণতা প্রমাণ করছে ভারত–আমেরিকা অর্থনৈতিক সম্পর্ক কতটা পারস্পরিক নির্ভরশীল। শুল্ক বাড়িয়ে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও বাস্তবে মার্কিন বাজার ভারতীয় পণ্য ছাড়া সহজে চলতে পারছে না। বিশেষ করে জেনেরিক ওষুধ, অটোমোবাইল যন্ত্রাংশ এবং সফটওয়্যার–সম্পর্কিত হার্ডওয়্যারে ভারতের বিকল্প খুবই সীমিত।
সোশ্যাল মিডিয়ায় এই রফতানি বৃদ্ধিকে ঘিরে শুরু হয়েছে জোর আলোচনা। অনেকেই একে ভারতের ‘অর্থনৈতিক আত্মবিশ্বাস’-এর প্রতীক হিসেবে তুলে ধরছেন। কোথাও কোথাও ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে বলা হচ্ছে, কড়া শুল্ক আরোপ করে আমেরিকা যেখানে ভারতের রফতানি কমাতে চেয়েছিল, সেখানে ফল হয়েছে উল্টো—রফতানি আরও বেড়েছে। কিছু পোস্টে শুল্কনীতির সঙ্গে বাস্তব বাণিজ্য পরিসংখ্যানের তুলনা টেনে রসিকতাও করা হয়েছে।
ভারতীয় রফতানিকারক সংগঠনগুলির বক্তব্য, এই সাফল্য ধরে রাখতে হলে আরও বাজার বৈচিত্র্য আনতে হবে এবং উৎপাদন দক্ষতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে তারা মনে করছেন, সরকার যদি বন্দর, লজিস্টিক্স ও দ্রুত শুল্ক ছাড়ের মতো ক্ষেত্রে আরও সংস্কার আনে, তাহলে আগামী মাসগুলিতেও রফতানির এই গতি বজায় রাখা সম্ভব।
সব মিলিয়ে, কঠিন আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির মধ্যেও আমেরিকার বাজারে ভারতের রফতানি বৃদ্ধি এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে। এটি শুধু পরিসংখ্যানগত সাফল্য নয়, বরং বৈশ্বিক বাণিজ্যে ভারতের অবস্থান যে আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী হয়েছে—তারই ইঙ্গিত। অনেকের চোখে, এটিই যেন কড়া শুল্কনীতির জবাবে ভারতের নীরব কিন্তু কার্যকর ‘চড়’।










