নয়াদিল্লি: বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আরও ৪০ জনের বিরুদ্ধে নতুন করে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ দায়ের করা হলো। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (ICT) দায়ের হওয়া এই মামলাটি সম্পর্কিত ২০১৩ সালের মে মাসের এক অগ্নিগর্ভ অধ্যায়ের সঙ্গে, যখন ঢাকার মতিঝিল ও তার আশেপাশের এলাকায় হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে পুলিশি অভিযানে ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছিল।
প্রধান প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, শাপলা চত্বরের সেই রক্তক্ষয়ী ঘটনায় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের শুনানি এবার ট্রাইব্যুনালে অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। একই সঙ্গে, তৎকালীন সেনাপ্রধান, একাধিক শীর্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং নিরাপত্তা কর্মকর্তাসহ পলাতক অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে বিশেষ আদালত। অন্যদিকে, প্রাক্তন মন্ত্রী, উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্তা ও সাংবাদিকসহ নয়জন অভিযুক্ত ইতিমধ্যে কারাবন্দি রয়েছেন।
যে পটভূমিতে দানা বেঁধেছিল ২০১৩-র সংঘাত
২০১৩ সালের ৫ মে কট্টরপন্থী সংগঠন হেফাজতে ইসলাম তাদের ১৩ দফা দাবি সামনে রেখে রাজধানী ঢাকায় এক বিশাল মহাসমাবেশের ডাক দেয়। ধর্ম অবমাননা রোধে নতুন আইন প্রণয়ন এবং কঠোর শাস্তির বিধান চালুর দাবি ছিল তাদের প্রধান এজেন্ডা। কিন্তু প্রশাসনের বেঁধে দেওয়া সময়সীমা পার হয়ে যাওয়ার পরও বিক্ষোভকারীরা অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে গেলে পরিস্থিতি জটিল আকার নেয়।
এরপরই মতিঝিলের শাপলা চত্বর ও বায়তুল মোকাররম চত্বর চত্বরে চরম নৈরাজ্য ছড়ায়। ধর্মীয় বইয়ের দোকান, প্রায় ৩০টি বাস ও একশর বেশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগ করা হয়। রাস্তা আটকে দেওয়ার উদ্দেশ্যে শত শত গাছ কেটে ফেলার পাশাপাশি সরকারি দফতর, ব্যাংক এবং রাজনৈতিক কার্যালয়ে ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয়। তৎকালীন প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এই আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জুগিয়েছিল।
নিহতের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক ও আইনি কোণঠাসা অবস্থা
পরিস্থিতি সামাল দিতে ওই দিন রাতে সাঁড়াশি অভিযান চালায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। প্রধান প্রসিকিউটরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তদন্তে জানা গেছে যে ৫ মে রাতে ঢাকা সহ মোট পাঁচটি জেলায় পুলিশের এই দমনপীড়নে ৫৮ জনের মৃত্যু হয়েছিল। মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ এই ঘটনাকে গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। যদিও তৎকালীন আওয়ামী লিগ সরকার দাবি করেছিল, সংঘর্ষ ও পদদলনের জেরে ৫ জন নিরাপত্তা কর্মীসহ মাত্র ১১ জনের প্রাণহানি ঘটেছে এবং মানবাধিকার সংগঠনের প্রকাশিত তালিকাটি কাল্পনিক।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লিগ সরকারের পতনের পর ভারতে আশ্রয় নেন শেখ হাসিনা। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধন করায় বিগত আমলের মানবতাবিরোধী অপরাধগুলির বিচার প্রক্রিয়া জোরদার হয়েছে। উল্লেখ্য, গত বছরের নভেম্বর মাসেই ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলন দমনের অভিযোগে একই ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল। একের পর এক গুরুতর অভিযোগে জর্জরিত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর আইনি লড়াই এখন আরও বেশি কঠিন হয়ে উঠেছে।





