কলকাতা: আজকের এই সামাজিক অবক্ষয়ের ক্রান্তিকালে (Surbharati)শিল্প এবং সংস্কৃতিতে ইতিহাস গড়তে চলেছে সুরভারতী সঙ্গীত কলাকেন্দ্র। গত ৩৪ বছর ধরে এই সংস্থা বাংলার শিল্প-সংস্কৃতিতে এক অনন্য অবদানের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। সংগীত, নৃত্য, বাদ্যযন্ত্র, চারুকলা, আবৃত্তি ও যোগের মতো বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে শিক্ষা, পরীক্ষা এবং নিয়মিত চর্চার মাধ্যমে ভারতীয় সংস্কৃতিকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজ করে চলেছে এই প্রতিষ্ঠান।
আগামী ৫ আগস্ট ২০২৬-এ ৩৪তম প্রতিষ্ঠা দিবস উপলক্ষে সুরভারতীর উদ্যোগ এবার পেতে চলেছে আরও বৃহৎ পরিসর। ভারত ও বিদেশে থাকা ১১৫০০-এরও বেশি অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান, ৬ লক্ষেরও বেশি শিক্ষার্থী এবং ১৫০০০ এরও বেশি শিক্ষক একই দিনে এই উদযাপনের সঙ্গে যুক্ত হতে চলেছেন। ফলে এই অনুষ্ঠান দেশের অন্যতম বৃহৎ সমন্বিত সাংস্কৃতিক আয়োজনের রূপ নিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
আরও দেখুনঃ মমতা শাসনে ঋণ বাড়লেও হয়নি বিনিয়োগ! CAG রিপোর্টে আর্থিক দুর্নীতিতে সরব শমীক
তিন দশকের বেশি সময় ধরে সুরভারতী সঙ্গীত কলাকেন্দ্র শুধু সাংস্কৃতিক শিক্ষার পরিসরেই কাজ করেনি, বরং বিভিন্ন প্রজন্মের শিল্পী, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের এক বৃহত্তর সাংস্কৃতিক পরিসরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। শহরের পাশাপাশি প্রত্যন্ত অঞ্চল এবং ছোট শহরের শিক্ষার্থীদেরও সংগীত, নৃত্য, আবৃত্তি, চিত্রকলা কিংবা অন্যান্য শিল্পমাধ্যমে নিজেদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ করে দেওয়াই এই উদ্যোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। প্রতিষ্ঠা দিবসের এই আয়োজন তাই শুধুমাত্র একটি প্রতিষ্ঠানের জন্মদিন উদযাপন নয়, বরং দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক যাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
সুরভারতীর কর্ণধার অরিজিৎ চক্রবর্ত্তীর কথাতেও উঠে এসেছে সাংস্কৃতিক শিক্ষার এই বৃহত্তর দর্শন। তাঁর মতে, বর্তমান সময়ে একজন ছাত্রের সাফল্যকে অনেক সময় নম্বর, চাকরি কিংবা প্রতিযোগিতার ফলাফলের ভিত্তিতে বিচার করা হয়। কিন্তু একটি জাতির প্রকৃত পরিচয় তৈরি হয় তার সংস্কৃতি, মূল্যবোধ, সৃজনশীলতা এবং মানবিকতার ভিতের উপর। শিক্ষা মানুষকে দক্ষ করে তুললেও সংস্কৃতি তাকে প্রকৃত অর্থে মানবিক করে তোলে এই ভাবনাকেই সামনে রেখে সুরভারতীর কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।
অরিজিৎ চক্রবর্ত্তী আরও জানিয়েছেন, প্রযুক্তির অগ্রগতির পাশাপাশি সংস্কৃতিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, যে সমাজ নিজের গান, নৃত্য, সাহিত্য, শিল্প ও ঐতিহ্যকে ভুলে যায়, সময়ের সঙ্গে সেই সমাজ নিজের পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হারাতে পারে। তাই ভবিষ্যতের ভারতকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক শিক্ষার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আরও দেখুনঃ পড়ুয়াদের পাশে দাঁড়িয়ে আলোচনার আর্জি দেবের, পথে নামলেন টলিপাড়ার তারকারাও
২০১২ সালে সুরভারতীর দায়িত্ব নেওয়ার সময় তাঁর সামনে ছিল আরও বড় একটি সাংস্কৃতিক শিক্ষা আন্দোলন গড়ে তোলার স্বপ্ন। সেই স্বপ্নের কেন্দ্রে ছিল দেশের প্রত্যন্ত গ্রামের একটি শিশুকেও বড় শহরের শিক্ষার্থীর মতো সমান মর্যাদা ও সুযোগ দেওয়া।
একই সঙ্গে নৃত্যশিল্পী, সংগীতশিল্পী, আবৃত্তিকার কিংবা চিত্রশিল্পীর সাধনাকে সমান সম্মান দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, আজ যখন হাজার হাজার প্রতিষ্ঠান, লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী এবং অসংখ্য শিক্ষক এই কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত, তখন সেটি গর্বের পাশাপাশি একটি বড় দায়িত্বও।
সুরভারতীর ৩৪তম প্রতিষ্ঠা দিবস সেই দায়িত্ববোধকেই আরও সামনে আনতে চলেছে। সংগঠনের বক্তব্য, দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিক্ষকরা নীরবে প্রতিদিন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের আলো জ্বালিয়ে রাখছেন। তাঁদের হাত ধরেই আগামী প্রজন্ম ভারতকে তার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের মাধ্যমে চিনবে। সেই কারণেই সুরভারতীর লক্ষ্য শুধু পরীক্ষা নেওয়া বা শংসাপত্র প্রদান নয়; শিল্পচর্চার প্রতি আত্মবিশ্বাস, সম্মান এবং ভালোবাসা তৈরি করাও তাদের অন্যতম উদ্দেশ্য।





