গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমসে (Commonwealth Games) ভারতের পদক অভিযান শুরু হলো এক অনুপ্রেরণার গল্প দিয়ে। পুরুষদের হেভিওয়েট প্যারা পাওয়ারলিফটিংয়ে ব্রোঞ্জ পদক জিতে দেশের ঝুলিতে প্রথম পদক যোগ করলেন বিহারের নালন্দার ২৯ বছরের ঝন্ডু কুমার। এই সাফল্য শুধু একটি পদক জয়ের গল্প নয়, বরং প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে অদম্য লড়াই, আত্মবিশ্বাস এবং কঠোর পরিশ্রমের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
প্রতিযোগিতায় ঝন্ডু গ্রুপ ‘বি’ থেকে অংশ নেন। প্রথম প্রচেষ্টার পর দ্বিতীয় চেষ্টায় তিনি ১৯০ কেজি ওজন সফলভাবে তুলে ১৩০.৯ পয়েন্ট অর্জন করেন। পদকের লড়াইয়ে এগিয়ে যাওয়ার জন্য শেষ প্রচেষ্টায় তিনি ১৯৬ কেজি তোলার চেষ্টা করেন। তবে সেই লিফটে সফল হতে পারেননি। তবুও দ্বিতীয় প্রচেষ্টায় তোলা ১৯০ কেজিই তাঁকে ব্রোঞ্জ পদক এনে দেয়।
এই ইভেন্টে নাইজেরিয়ার রিলুওয়ান ইদ্রিস ২০৮ কেজি ওজন তুলে ১৩২.৮ পয়েন্ট নিয়ে সোনা জেতেন। ইংল্যান্ডের ম্যাথিউ হার্ডিং ১৯৯ কেজি তুলে ১৩১.০ পয়েন্ট নিয়ে রুপো পান। ঝন্ডুর সংগ্রহ করা ১৩০.৯ পয়েন্টই ভারতের প্রথম পদক নিশ্চিত করে।
শেষ প্রচেষ্টায় ব্যর্থ হওয়ার কারণও জানিয়েছেন ভারতীয় অ্যাথলিট। তাঁর কথায়, শেষ লিফটের সময় বারবেল র্যাকে আটকে যাওয়ায় ছন্দ নষ্ট হয়ে যায়। ফলে সময়মতো লিফট সম্পূর্ণ করতে পারেননি। তবে সেই হতাশার চেয়ে দেশের হয়ে প্রথম পদক জয়ের আনন্দই তাঁর কাছে অনেক বড়।
পদক জয়ের পর আবেগঘন প্রতিক্রিয়ায় ঝন্ডু বলেন, ভারতের জন্য প্রথম পদক জিততে পারা তাঁর জীবনের অন্যতম সেরা মুহূর্ত। জাতীয় পতাকা উড়তে দেখলে তাঁর গর্ব হয়। এই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। দেশে ফিরে প্রথমেই বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলবেন এবং সেই সঙ্গে গৌতম ভাইয়াকে ধন্যবাদ জানাবেন, যাঁর সঙ্গে ছোটবেলা থেকেই অনুশীলন করেছেন।
ঝন্ডুর জীবনসংগ্রামের গল্প আরও বেশি অনুপ্রেরণাদায়ক। জন্ম থেকেই তিনি পোলিও আক্রান্ত। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কখনও তাঁর স্বপ্নকে থামাতে পারেনি। কিন্তু আর্থিক অনটন ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় বাধা। ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে রাস্তার ধারে আলু-পেঁয়াজ বিক্রি করেছেন। পরে সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে কোভিড মহামারির সময়ে ই-রিকশা চালিয়েও জীবিকা নির্বাহ করেছেন।
দলবদলের বাজারে বড় চমক! ইস্টবেঙ্গল ছেড়ে পুরনো ডেরা ওড়িশাতে নন্দকুমার
২০১৭ সালে প্যারা অ্যাথলেটিক্স দিয়ে ক্রীড়াজীবন শুরু করলেও পরে তিনি পাওয়ারলিফটিংয়ে মনোনিবেশ করেন। প্রতিভা থাকলেও অর্থের অভাবে জাতীয় স্তরের প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়াই কঠিন হয়ে পড়েছিল। ২০২৩ সালে জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে খেলতে যাওয়ার খরচ জোগাতে নিজের একমাত্র ই-রিকশাটিও বিক্রি করতে হয়েছিল তাঁকে। সেই প্রতিযোগিতাই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে ঝন্ডুর পারফরম্যান্স নজরে আসে প্যারালিম্পিক্সে ব্রোঞ্জজয়ী রাজিন্দর সিং রাহেলুর। তাঁর পরামর্শে ভারতীয় ক্রীড়া কর্তৃপক্ষের (SAI) গান্ধীনগর প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে অনুশীলনের সুযোগ পান ঝন্ডু। সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁর দ্রুত উন্নতির পথচলা। কঠোর অনুশীলন ও সঠিক দিকনির্দেশনায় অল্প সময়ের মধ্যেই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে নিজের পরিচিতি তৈরি করেন তিনি।
হাসপাতালে পরিণত টিম ইন্ডিয়া! বড় তদন্তে নামছে BCCI
এর আগে জাতীয় রেকর্ড গড়ার পাশাপাশি ২০২৫ সালের বেজিং বিশ্বকাপে ব্রোঞ্জ পদক জিতেছিলেন ঝন্ডু। ২০২৬ সালের এশিয়ান ও ওশিয়ানিয়া চ্যাম্পিয়নশিপেও ব্রোঞ্জ জয় করে নিজের ধারাবাহিকতা প্রমাণ করেছিলেন। এবার কমনওয়েলথ গেমসের মঞ্চেও পদক জিতে তিনি সেই সাফল্যের মুকুটে আরও একটি পালক যোগ করলেন।
গ্লাসগোয় ব্রোঞ্জ জয়ের মাধ্যমে শুধু ভারতের পদকের খাতাই খুললেন না, অসংখ্য সংগ্রামী মানুষের কাছেও অনুপ্রেরণার প্রতীক হয়ে উঠলেন ঝন্ডু কুমার।





