ফুটবল বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পর থেকেই একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে আর্জেন্টিনার জার্সিতে আর কতদিন দেখা যাবে লিওনেল মেসিকে? ৩৯ বছর বয়সেও অসাধারণ পারফরম্যান্স উপহার দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন, বড় মঞ্চে এখনও তাঁর জাদু অটুট। তবুও আন্তর্জাতিক ফুটবলে তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে জল্পনা থামছে না। এবার সেই জল্পনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে আর্জেন্টিনার সংবাদমাধ্যম। স্থানীয় একাধিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, মেসি আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্ত মোটামুটি চূড়ান্ত করে ফেলেছেন। তবে এখনই তিনি জাতীয় দলকে বিদায় জানাচ্ছেন না। বরং আরও কয়েক মাস আর্জেন্টিনার হয়ে খেলবেন এবং দলের প্রজন্ম বদলের সময় তরুণ ফুটবলারদের পাশে থাকবেন। এরপরই আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানাতে পারেন তিনি।
সম্প্রতি শেষ হওয়া বিশ্বকাপে মেসির পারফরম্যান্স ছিল নজরকাড়া। পুরো টুর্নামেন্টে তিনি আটটি গোল করেন এবং চারটি গোলে সরাসরি সহায়তা করেন। শুধু তাই নয়, ম্যাচের পর ম্যাচ তিনি অসংখ্য গোলের সুযোগও তৈরি করে দিয়েছেন সতীর্থদের জন্য। তাঁর ধারাবাহিক পারফরম্যান্স দেখে অনেকেই মনে করেছিলেন, টুর্নামেন্টের সেরা ফুটবলারের স্বীকৃতি তাঁরই প্রাপ্য ছিল। সেই পুরস্কার না পাওয়ায় ফুটবল মহলে বিতর্কও তৈরি হয়। এত ভালো ছন্দে থাকার পরও কেন অবসরের ভাবনা? এর পিছনে রয়েছে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। কোচ লিওনেল স্কালোনি আগামী বিশ্বকাপকে সামনে রেখে নতুন একটি দল গড়ে তুলতে চান। বর্তমান স্কোয়াডের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ফুটবলারের বয়স ৩৫ বছরের বেশি। ফলে ধীরে ধীরে তরুণদের দায়িত্ব তুলে দেওয়া ছাড়া অন্য কোনও উপায় নেই।
তবে স্কালোনি একসঙ্গে পুরো দল বদলে দেওয়ার পক্ষপাতী নন। তাঁর পরিকল্পনা ধাপে ধাপে নতুন প্রজন্মকে আন্তর্জাতিক ফুটবলে প্রতিষ্ঠিত করা। অভিজ্ঞদের পাশে রেখেই তরুণদের বড় মঞ্চে মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ দিতে চান তিনি। সেই পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবেই কিছুদিন জাতীয় দলে থেকে যেতে চান মেসি। খবর অনুযায়ী, কোচের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। তিনি মনে করেন, নতুন ফুটবলারদের আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আত্মবিশ্বাসী করে তুলতে তাঁর অভিজ্ঞতা কাজে লাগতে পারে। মাঠে এবং মাঠের বাইরে—দুই জায়গাতেই তরুণদের পথ দেখাতে চান তিনি। তাই আপাতত জাতীয় দলের দায়িত্ব ছাড়ছেন না।
তবে ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজের অবস্থানও পরিষ্কার করে দিয়েছেন মেসি। তিনি ইতিমধ্যেই স্কালোনিকে জানিয়ে দিয়েছেন, আগামী বিশ্বকাপে তাঁর খেলার কোনও পরিকল্পনা নেই। অর্থাৎ আগামী বিশ্বকাপের দল গড়ার সময় তাঁকে বাদ রেখেই পরিকল্পনা করতে হবে। একই বার্তা নাকি পৌঁছে গিয়েছে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (এএফএ) শীর্ষ কর্তাদের কাছেও। এএফএ-ও মেসির সিদ্ধান্তকে সম্পূর্ণ সম্মান জানাতে চায়। সংস্থার অভ্যন্তরীণ সূত্রের দাবি, মেসি আনুষ্ঠানিকভাবে অবসরের ঘোষণা করলেই তাঁর জন্য বিশেষ বিদায়ী ম্যাচের আয়োজন করা হবে। সেই ম্যাচ আর্জেন্টিনার মাটিতেই হওয়ার সম্ভাবনা বেশি, যাতে দেশের সমর্থকদের সামনে শেষবারের মতো নীল-সাদা জার্সিতে মাঠে নামতে পারেন সর্বকালের অন্যতম সেরা এই ফুটবলার।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, মেসির উপর কোনও চাপ সৃষ্টি করতে চাইছেন না কোচ বা এএফএ কর্তারা। কখন অবসর নেবেন, সেই সিদ্ধান্ত পুরোপুরি তাঁর ব্যক্তিগত। তিনি নিজে সবুজ সংকেত দিলেই বিদায় সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতি শুরু হবে। ফুটবল ইতিহাসে মেসির অবদান ইতিমধ্যেই অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। তাই আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে তাঁর বিদায় শুধু আর্জেন্টিনার নয়, গোটা ফুটবল বিশ্বের জন্যই একটি আবেগঘন মুহূর্ত হয়ে থাকবে। আপাতত অবশ্য সমর্থকদের স্বস্তির খবর একটাই লিওনেল মেসির জাদু এখনও কিছুদিন নীল-সাদা জার্সিতে দেখা যাবে। তবে সেই অধ্যায়ের শেষ পাতা যে আর খুব বেশি দূরে নয়, তার ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়ে উঠছে।





