কলকাতা: পশ্চিম এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে আবারও যুদ্ধের দামামা। ইরান ও ইজরায়েলের মধ্যকার যুদ্ধবিরতি যখন আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে এক বৃহত্তর কূটনৈতিক বোঝাপড়ার পথ প্রশস্ত করছিল, ঠিক তখনই সমস্ত আশায় জল ঢেলে নতুন করে চরম সংঘাতের মুখে দাঁড়াল পশ্চিম এশিয়া। লেবাননে ইজরায়েলি বিমান হামলার পাল্টা জবাব দিতে ইজরায়েলকে লক্ষ্য করে ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ল ইরান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে যুদ্ধবিরতি টিকিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছিলেন, ইরানের এই পদক্ষেপ তাকে এক বড়সড় চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়ে দিল। (Iran-US Peace Talks Take A Hit again)
সূত্রের খবর, বৈরুত এবং দক্ষিণ লেবাননে ইজরায়েলের সাম্প্রতিক আগ্রাসনের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প খোদ ইজরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে ফোন করে সংযম বজায় রাখার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। কিন্তু সেই অনুরোধ অগ্রাহ্য করেই হামলা চালায় ইজরায়েল। এই পাল্টাপাল্টি আঘাতের পর তেহরান তাদের দীর্ঘদিনের অবস্থানে আরও অনড় হয়েছে। ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, ইজরায়েল যদি লেবাননে সামরিক অভিযান বন্ধ না করে, তবে ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোনও স্থায়ী শান্তি চুক্তি সম্ভব নয়।
ইরানের দাবিতে কেন কেন্দ্রীয় চরিত্র লেবানন ও হিজবুল্লাহ?
ইরানের কাছে লেবানন এখন আর কোনও পার্শ্ববর্তী রণক্ষেত্র নয়। তেহরান তাদের ‘অ্যাক্সিস অফ রেজিস্ট্যান্স’ বা প্রতিরোধ অক্ষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং বিশ্বস্ত সহযোগী হিসেবে দেখে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহকে। ফলে হিজবুল্লাহর ঘাঁটি বা কমান্ডারদের ওপর ইজরায়েলি হামলাকে ইরান কেবল একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর ওপর আক্রমণ হিসেবে দেখছে না, বরং এটিকে ইরানের নিজস্ব আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে বিবেচনা করছে।
গত এক সপ্তাহে ইরানি কূটনীতিকরা বারবার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, আমেরিকার সঙ্গে যেকোনো শান্তি প্রক্রিয়ার পূর্বশর্ত হলো লেবানন এবং গাজা সহ ‘সমস্ত ফ্রন্টে’ সম্পূর্ণ যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা। তেহরানের যুক্তি, ওয়াশিংটন একদিকে ইরানের সঙ্গে কূটনীতির টেবিল গরম করবে, আর অন্যদিকে তাদের মিত্র ইজরায়েলকে দিয়ে ইরানের সহযোগীদের ওপর হামলা চালাবে, এটা একসঙ্গে চলতে পারে না।
ইতিহাসের প্রেক্ষাপট ও হিজবুল্লাহর গুরুত্ব
ইরান ও লেবাননের এই সম্পর্কের শিকড় অনেক গভীরে। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর এবং ১৯৮২ সালে লেবাননে ইজরায়েলি আগ্রাসনের সময় ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডসের হাত ধরেই হিজবুল্লাহর জন্ম ও প্রশিক্ষণ। বিগত চার দশকে হিজবুল্লাহ কেবল একটি সশস্ত্র সংগঠনই নয়, বরং লেবাননের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। ২০০০ সালে দক্ষিণ লেবানন থেকে ইজরায়েলের পিছু হটা, ২০০৬ সালের ইজরায়েল-হিজবুল্লাহ যুদ্ধ কিংবা সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে বাশার আল-আসাদ সরকারকে টিকিয়ে রাখা— সবক্ষেত্রেই হিজবুল্লাহ ছিল তেহরানের তুরুপের তাস। তাই হিজবুল্লাহকে দুর্বল করার যেকোনো চেষ্টাকে ইরান নিজেদের অস্তিত্বের সংকট হিসেবে দেখছে।
সংযমের পক্ষে ট্রাম্প ও বিশ্ব তেলের বাজারে আগুন
ট্রাম্প প্রশাসন মনে করছে, বর্তমান সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে তারা ইরানের সঙ্গে একটি বড় কূটনৈতিক সাফল্যের সবচেয়ে কাছাকাছি দাঁড়িয়ে রয়েছে। আর সেই কারণেই সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পরেও ট্রাম্প আলোচনা জিইয়ে রাখার বার্তা দিয়েছেন এবং ইজরায়েলকে সংযত হতে চাপ দিচ্ছেন। তবে আমেরিকার জন্য এই ভারসাম্য বজায় রাখা কঠিন, কারণ ইজরায়েল হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে তাদের সামরিক স্বাধীনতা ছাড়তে নারাজ, আর ইরান ঠিক তার উল্টো দাবিতে অনড়।
এই ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার আঁচ এসে পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতিতেও। ৮ জুন সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এক ধাক্কায় অনেকটাই বেড়ে গিয়েছে। জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেল প্রতি ৯৬ ডলার পার করে গিয়েছে। অন্যদিকে মার্কিন বেঞ্চমার্ক ডব্লিউটিআই (WTI) ক্রুডের দামও প্রায় ৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। লেবাননে একটি মাত্র সামরিক আঘাত যে পুরো বিশ্ব অর্থনীতি এবং কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে ওলটপালট করে দিতে পারে, এই ঘটনা তারই প্রমাণ।




















