
আই লিগের ট্রফি তখন ডায়মন্ড হারবার এফসির (Diamond Harbour FC) হাতে। কল্যাণী স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে উচ্ছ্বাস, মাঠজুড়ে ফুটবলারদের উদ্যাপন। এক ম্যাচ আগেই চ্যাম্পিয়ন নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল কিবু ভিকুনার দল। শেষ ম্যাচে ডেম্পোর বিরুদ্ধে ড্র করলেও পয়েন্ট তালিকার শীর্ষস্থান অটুট ছিল। কিন্তু সেই সন্ধ্যায় শুধুই ফুটবল নয়, অন্য এক আবেগও জায়গা করে নিল দর্শকদের হৃদয়ে। কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন দলের গোলরক্ষক ধীরজ সিং মৈরংথেম।
ডায়মন্ড হারবারের আই লিগ জয়ের মুহূর্তকে স্মরণীয় করে রাখতে বিশেষ পরিকল্পনা করেছিলেন মণিপুরের এই তরুণ গোলকিপার। ট্রফি জয়ের আনন্দের মধ্যেই তিনি নিজের দীর্ঘদিনের প্রেমিকা সোনিয়াকে সকলের সামনে বিয়ের প্রস্তাব দেন। মাঠের সেই মুহূর্ত এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল।
খেলা শেষ হওয়ার পর সতীর্থদের সঙ্গে উৎসবে মেতে উঠেছিলেন ধীরজ। গলায় তখন চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মেডেল। কিছুক্ষণ পর তিনি এগিয়ে যান মাঠের এক পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সোনিয়ার দিকে। প্রথমে নিজের জয়ের মেডেলটি তুলে দেন তাঁর গলায়। তারপর আচমকাই হাঁটু গেড়ে বসে পড়েন। হাতে একটি আংটি আর ফুলের তোড়া। কয়েক মুহূর্তের জন্য যেন স্তব্ধ হয়ে যায় চারপাশ। ধীরজের সেই ভালোবাসার প্রস্তাবে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন সোনিয়া। হাসিমুখে সম্মতি জানান তিনি। আনন্দে চোখ ভিজে ওঠে তাঁরও।
এই দৃশ্য দেখেই হাততালিতে ফেটে পড়েন ডায়মন্ড হারবারের ফুটবলাররা। মাঠের মধ্যেই শুরু হয় অন্য এক উদ্যাপন। ফুটবলপ্রেমীরাও এই দৃশ্যকে দিনের সেরা মুহূর্ত বলে উল্লেখ করেছেন। অনেকে লিখেছেন, ট্রফি জয়ের আনন্দের সঙ্গে এমন ভালোবাসার প্রকাশ ভারতীয় ফুটবলে বিরল।
ধীরজের ফুটবল যাত্রাও কম লড়াইয়ের নয়। দেশের মাটিতে আয়োজিত অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপে নজর কাড়েন তিনি। সেই টুর্নামেন্টেই ভারতীয় ফুটবলের ভবিষ্যৎ তারকা হিসেবে উঠে আসেন মণিপুরের এই গোলরক্ষক। পরে ইন্ডিয়ান অ্যারোজের হয়ে আই লিগে খেলেন। এরপর সুযোগ পান আইএসএলেও। এফসি গোয়া ও কেরালা ব্লাস্টার্সের জার্সিতে খেলেছেন তিনি। বিশেষ করে এফসি গোয়ার হয়ে তিন মরশুমে ৫৩টি ম্যাচ খেলে নিজের দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছিলেন।
গত মরশুমে তিনি যোগ দেন মোহনবাগানে। কিন্তু সেখানে নিয়মিত সুযোগ পাননি। মাত্র একটি ম্যাচ খেলেই প্রায় পুরো সময় বেঞ্চে কাটাতে হয় তাঁকে। নতুন মরশুমে তাই ডায়মন্ড হারবার এফসিতে যোগ দেন ধীরজ। সেই সিদ্ধান্ত যে সঠিক ছিল, তা প্রমাণ করে দিয়েছেন গোটা মরশুম জুড়ে। তেকাঠির নিচে তাঁর নির্ভরযোগ্য পারফরম্যান্স দলের সাফল্যে বড় ভূমিকা নেয়।
ডায়মন্ড হারবার এফসির জন্যও এই সাফল্য ঐতিহাসিক। মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল ও মহামেডানের পর বাংলা থেকে এবার আইএসএলে জায়গা করে নিল আরও একটি ক্লাব। আই লিগ চ্যাম্পিয়ন হয়ে দেশের সেরা লিগে খেলার ছাড়পত্র পেয়েছে তারা। মহামেডান অবনমনে চলে গেলেও বাংলার ফুটবল মানচিত্রে নতুন আশার আলো হয়ে উঠেছে ডায়মন্ড হারবার।
তবে ট্রফি জয়ের এই সন্ধ্যায় সবচেয়ে বেশি মনে থাকবে ধীরজের সেই ভালোবাসার মুহূর্ত। ফুটবল মাঠে গোল বাঁচানো তাঁর কাজ, কিন্তু সেদিন তিনি জিতে নিলেন আরও বড় কিছু, প্রিয় মানুষের হৃদয়।













