কলকাতা: কলকাতার সল্টলেকে ইডি অফিসের সামনে সকাল থেকেই ছিল উৎকণ্ঠা। (Ansar Sheikh)গাড়ি থেকে নেমে নীল শার্ট আর ট্রাউজার্স পরা এক যুবক সোজা ভিতরে ঢুকে গেলেন। তিনি ঝাড়গ্রামের অতিরিক্ত জেলাশাসক (এডিএম) আনসার শেখ। বালি পাচার মামলায় দ্বিতীয়বারের সমন পেয়ে তিনি বুধবার ইডির সামনে হাজির হলেন। এই ঘটনা রাজ্যের প্রশাসনিক মহলে বেশ আলোড়ন তুলেছে।
আনসার শেখ, যিনি মূলত মালদার এডিএম হিসেবে পরিচিত এবং সাম্প্রতিক পোস্টিংয়ে ঝাড়গ্রামের দায়িত্বে ছিলেন, তাঁর উপস্থিতি ইডির তদন্তকে নতুন মোড় দিয়েছে। সূত্র অনুসারে, বালি পাচারের এক বড় র্যাকেটের সঙ্গে যুক্ত সন্দেহে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। প্রথম সমনের পর তিনি সাড়া না দেওয়ায় দ্বিতীয়বার সমন জারি করা হয়। আজ তিনি নিজে হাজির হয়ে তদন্তে সহযোগিতা করছেন বলে জানা গেছে।
আরও দেখুনঃ ট্রাম্পের মাটিতে দাঁড়িয়ে ভারতকে মুছে ফেলার হুমকি পাক সেনেটরের
ঝাড়গ্রাম জেলা দক্ষিণবঙ্গের একটি বনাঞ্চল ঘেরা এলাকা। সুবর্ণরেখা নদীসহ বিভিন্ন নদী থেকে বালি উত্তোলনের অনুমতি থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ উঠছে অবৈধভাবে বিপুল পরিমাণ বালি পাচার হচ্ছে। ইডির অভিযানে গোপীবল্লভপুর, বেলিয়াবেড়িয়া, জামবনি এলাকায় একাধিক বালি ব্যবসায়ীর বাড়ি-অফিসে তল্লাশি চলেছে। শেখ জহিরুল আলির মতো ব্যক্তিদের বাড়ি থেকে কোটি টাকার নগদ উদ্ধার হয়েছে।
তাঁদের অতি দ্রুত ধনী হয়ে ওঠার পিছনে প্রশাসনিক সহায়তার অভিযোগ উঠেছে। এই প্রেক্ষাপটে একজন জেলা প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার নাম জড়িয়ে যাওয়ায় বিষয়টি আরও গুরুতর হয়ে উঠেছে।আনসার শেখ নিজে এক উজ্জ্বল উদাহরণ। মহারাষ্ট্রের জালনার এক সাধারণ অটো চালকের ছেলে হয়েও ২১ বছর বয়সে ইউপিএসসি ক্র্যাক করে ভারতের সবচেয়ে কম বয়সি আইএএস অফিসার হিসেবে খ্যাতি পেয়েছিলেন।
কঠিন পরিস্থিতি থেকে উঠে আসা এই যুবকের ক্যারিয়ার সবসময় প্রশংসিত হয়েছে। কিন্তু আজ তাঁকে যে অভিযোগের মুখোমুখি হতে হচ্ছে, তা তাঁর ব্যক্তিগত ইমেজের সঙ্গে মেলে না। তবে আইনের চোখে সবাই সমান। ইডি কর্মকর্তারা তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করে জানতে চাইছেন জেলার বালি মাইনিংয়ের অনুমোদন, পরিবহন এবং নিয়ন্ত্রণে তাঁর ভূমিকা কী ছিল? কোনো অবৈধ নেটওয়ার্কের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল কি না? স্থানীয় সূত্র বলছে, ঝাড়গ্রামে বালি পাচার একটি সংগঠিত চক্র।
রাতের অন্ধকারে ট্রাক বোঝাই করে বালি চলে যায় বিভিন্ন জায়গায়। পরিবেশের ক্ষতি তো আছেই, সঙ্গে সরকারি রাজস্বের ব্যাপক লোকসান। নদীর তীরবর্তী গ্রামগুলোতে এই পাচারের কারণে জমি ভাঙছে, কৃষি জমি নষ্ট হচ্ছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ দীর্ঘদিনের। ইডির এই অভিযানকে অনেকে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে প্রশাসনের অন্দরে এটা নিয়ে চাপা উত্তেজনা।ইডি সূত্র জানিয়েছে, তদন্ত এখনও চলছে। আনসার শেখের বয়ান রেকর্ড করা হচ্ছে।
প্রয়োজনে তাঁকে আবারও ডাকা হতে পারে। এই মামলায় আরও কয়েকজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীর নাম উঠে আসতে পারে। রাজ্য সরকারের তরফে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া আসেনি। তবে বিজেপি নেতারা এটাকে তৃণমূলের আমলে দুর্নীতির প্রমাণ বলে আক্রমণ করেছেন। তৃণমূলের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তদন্ত চলুক, কিন্তু কাউকে হয়রানি করা চলবে না।
এই ঘটনা রাজ্যের আমলাতন্ত্রে একটা সতর্কবার্তা। যাঁরা জনসেবায় নিয়োজিত, তাঁদের স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হবে। আনসার শেখের মতো প্রতিভাবান অফিসারের ক্যারিয়ার যাতে এতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকে সবার নজর। তিনি যদি নির্দোষ প্রমাণিত হন, তাহলে তাঁর সুনাম ফিরে পাবেন। আর যদি কোনও অনিয়ম ধরা পড়ে, তাহলে আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে।




















