কলকাতা: সল্টলেক স্টেডিয়াম (Salt Lake Stadium), যাকে একসময় ‘ভারতের ফুটবল মক্কা’ বলা হত—আজ সেই পরিচয় কতটা অটুট? ব্যবহার, রক্ষণাবেক্ষণ ও দর্শক উপস্থিতির সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান এই প্রশ্নটাই সামনে তুলে দিচ্ছে।একসময় প্রায় ১,২০,০০০ দর্শক ধারণক্ষমতা নিয়ে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম স্টেডিয়াম ছিল সল্টলেক। ২০১৭ সালে FIFA U-17 World Cup-এর আগে সংস্কারের পর বর্তমানে আসনসংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬৬,০০০।
আধুনিক আসন, উন্নত লাইটিং ও টার্ফের জন্য এই পরিবর্তন জরুরি ছিল ঠিকই, কিন্তু দর্শক উপস্থিতির গ্রাফ বলছে অন্য গল্প। আইএসএল এর ম্যাচগুলিতে গড় দর্শকসংখ্যা গত কয়েক বছরে ওঠানামা করেছে। ২০১৯-২০ মরসুমে যেখানে গড়ে ৫০,০০০-এর বেশি দর্শক এসেছেন কলকাতার ম্যাচে, সেখানে ২০২৩-২৪ মরসুমে তা নেমে এসেছে প্রায় ৩০,০০০-৩৫,০০০-এ। বড় ম্যাচ—বিশেষ করে Mohun Bagan Super Giant বনাম East Bengal FC ডার্বিতে এখনও ৬০,০০০ ছুঁয়ে যায় উপস্থিতি, কিন্তু সাধারণ ম্যাচে গ্যালারি অনেকটাই ফাঁকা থাকে।
স্টেডিয়ামের ব্যবহারও আগের মতো ঘন নয়। আগে যেখানে লিগ, কাপ, আন্তর্জাতিক ম্যাচ মিলিয়ে বছরে ৪০-৫০টি বড় ম্যাচ হত, এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০-২৫-এ। এর একটি কারণ হল শহরের অন্যান্য ভেন্যুর ব্যবহার বৃদ্ধি এবং ক্লাবগুলির নিজস্ব ট্রেনিং গ্রাউন্ডে ঝোঁক।
তাছাড়া, I-League-এর বেশ কিছু ম্যাচ এখন ছোট ভেন্যুতে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে, যেখানে অপারেশনাল খরচ কম। রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রেও চ্যালেঞ্জ কম নয়। এত বড় স্টেডিয়াম চালাতে বছরে আনুমানিক ১৫-২০ কোটি টাকা খরচ হয় বলে ক্রীড়া দপ্তরের সূত্রে জানা যায়। বিদ্যুৎ, ঘাসের টার্ফ, নিরাপত্তা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা—সব মিলিয়ে খরচ বাড়ছে। কিন্তু আয় সেই তুলনায় বাড়েনি। ম্যাচের টিকিট বিক্রি, স্পনসরশিপ ও ইভেন্ট থেকে যা আয় হয়, তা দিয়ে পুরো ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়ছে।তবে শুধু নেতিবাচক ছবিই নয়, আশার আলোও রয়েছে। বড় ম্যাচ বা আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট হলে এখনও সল্টলেকই প্রথম পছন্দ। এআইএফএফ ও গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের জন্য এই স্টেডিয়ামকেই বেছে নেয়। এছাড়া, উন্নত অবকাঠামো ও যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য দর্শকদের কাছে এখনও এটি অন্যতম আকর্ষণীয় ভেন্যু।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যার মূল জায়গা ‘ম্যাচডে এক্সপেরিয়েন্স’। ইউরোপীয় ক্লাব সংস্কৃতির মতো খাবার, বিনোদন, ফ্যান এনগেজমেন্ট—এই দিকগুলো এখনও যথেষ্ট উন্নত হয়নি। ফলে নতুন প্রজন্ম স্টেডিয়ামে যাওয়ার চেয়ে টিভি বা মোবাইলে ম্যাচ দেখতে বেশি স্বচ্ছন্দ। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আইএসএলের ভিউয়ারশিপ বাড়লেও মাঠে সেই ভিড় আর আগের মতো নেই। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল নিরাপত্তা ও ভিড় ব্যবস্থাপনা। অতীতে কয়েকটি অপ্রীতিকর ঘটনার পর অনেক দর্শক পরিবার নিয়ে স্টেডিয়ামে আসতে দ্বিধা বোধ করেন।
ফলে গ্যালারির আবেগ থাকলেও সংখ্যাটা কমে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে প্রশ্নটা থেকেই যাচ্ছে—সল্টলেক কি এখনও ভারতের ফুটবল মক্কা? ইতিহাস, আবেগ ও পরিকাঠামোর দিক থেকে উত্তর এখনও ‘হ্যাঁ’। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, সেই মর্যাদা ধরে রাখতে গেলে নতুনভাবে ভাবতে হবে। নিয়মিত ইভেন্ট, উন্নত দর্শক অভিজ্ঞতা এবং আর্থিক মডেলের পরিবর্তন—এই তিনটি দিকেই জোর না দিলে, ‘মক্কা’র তকমা শুধু স্মৃতিতেই সীমাবদ্ধ হয়ে যেতে পারে।




















