মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই নতুন করে ছড়াল চাঞ্চল্য। (Liaowang-1)এই উত্তেজনা বাড়িয়ে দিল চীনের একটি অত্যাধুনিক গোয়েন্দা জাহাজের উপস্থিতি। সাম্প্রতিক স্যাটেলাইট ডেটা ও প্রতিরক্ষা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি নেভির (PLAN) আধুনিক স্পেস-ট্র্যাকিং ও গোয়েন্দা জাহাজ Liaowang-1 বর্তমানে ওমান উপসাগর অঞ্চলের কাছে রয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। এই জাহাজটি উত্তর ভারতীয় মহাসাগর এলাকায় ঘোরাফেরা করছে বলেও জানা গেছে।
বিশ্বজুড়ে যখন ইরান, ইসরায়েল এবং আমেরিকার মধ্যে চলতে থাকা যুদ্ধ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে, ঠিক সেই সময়ে চীনের এই উপস্থিতিকে অনেক বিশ্লেষক কৌশলগত বার্তা হিসেবেই দেখছেন। অনেকের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে চীন সরাসরি জড়িত না হলেও তার নজরদারি ক্ষমতা বাড়িয়ে পরিস্থিতির ওপর প্রভাব রাখতে চাইছে। আবার অনেক কূটনীতিকদের মতে রাশিয়ার পাশাপাশি এবার চীনও ইরানকে গোয়েন্দা তথ্য দেবে। আর তাতে ইরান আরও তাড়াতাড়ি ইসরায়েল-আমেরিকার যৌথ হামলা সামাল দিতে পারবে। আবার অনেকেই মনে করছেন এই হয়তো আমেরিকার হারের শুরু।
আরও দেখুনঃ বৈধ ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনরের কুশ পুতুল দাহ নবদ্বীপে
Liaowang-1 আসলে চীনের নতুন প্রজন্মের মেরিটাইম স্পেস-ট্র্যাকিং ও গোয়েন্দা জাহাজ। ২০২৩ সালে এটি চালু করা হয়। প্রায় ৩০,০০০ টন ওজনের এই বিশাল জাহাজটির দৈর্ঘ্য প্রায় ২২৫ মিটার। এটি মূলত পুরনো ইউয়ান ওয়াং ক্লাস ট্র্যাকিং শিপসের পরিবর্তে ব্যবহার করার জন্য তৈরি করা হয়েছে।
জাহাজটিতে অত্যাধুনিক রাডার, সেন্সর অ্যারে এবং ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম রয়েছে। এর প্রধান কাজ হল সামরিক স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণ, মিসাইল লঞ্চ ট্র্যাকিং, যুদ্ধজাহাজ ও যুদ্ধবিমানের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ এবং রিয়েল-টাইম গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা। প্রতিরক্ষা সূত্রের মতে, এই জাহাজের নজরদারি ক্ষমতা প্রায় ৬,০০০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত। অর্থাৎ বিশাল একটি অঞ্চল জুড়ে এটি ইলেকট্রনিক সিগন্যাল এবং সামরিক গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতে পারে।
শুধু তাই নয়, এই জাহাজকে একটি মোবাইল কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টার হিসেবেও ব্যবহার করা যায়। ফলে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বিভিন্ন ধরনের ডেটা সংগ্রহ করে তা দ্রুত বিশ্লেষণ এবং প্রেরণ করা সম্ভব হয়। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এই জাহাজ একা নয়। খবর অনুযায়ী, এটিকে রক্ষা করতে চীনের শক্তিশালী যুদ্ধজাহাজও মোতায়েন করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে একটি Type 055 destroyer এবং একটি Type 052D destroyer। এই জাহাজগুলোকে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী আধুনিক ডেস্ট্রয়ারগুলোর মধ্যে ধরা হয়।
এদিকে একই অঞ্চলে আমেরিকার নৌবাহিনীও শক্তিশালী উপস্থিতি বজায় রেখেছে। বিশেষ করে আমেরিকার বিমানবাহী রণতরী গ্রুপ, যুদ্ধজাহাজ এবং উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইতিমধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় মোতায়েন রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, চীনের এই গোয়েন্দা জাহাজ সম্ভবত মার্কিন নৌবাহিনীর গতিবিধি, ইলেকট্রোম্যাগনেটিক সিগন্যাল এবং আধুনিক স্টিলথ যুদ্ধবিমান যেমন F-35 Lightning II এর কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করছে।
কিছু আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, সংগৃহীত তথ্য সম্ভাব্যভাবে ইরানের সঙ্গেও ভাগ করে নেওয়া হতে পারে। যদিও এ বিষয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ নেই। তবে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, চীন ও ইরানের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্কের কারণে এই ধরনের সহযোগিতা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
চীন দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যে তার প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে। বিশেষ করে জ্বালানি আমদানি, বাণিজ্যিক রুট এবং Belt and Road Initiative-এর কারণে এই অঞ্চলে বেইজিংয়ের কৌশলগত আগ্রহ অনেক বেশি। সেই কারণেই ওমান উপসাগরে এই গোয়েন্দা জাহাজের উপস্থিতি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি শুধু আঞ্চলিক নয়, বরং বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যের সঙ্গে জড়িত। একদিকে আমেরিকা ও তার মিত্রদের সামরিক উপস্থিতি বাড়ছে, অন্যদিকে চীনও পরিস্থিতির ওপর ঘনিষ্ঠ নজর রাখছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও বড় আন্তর্জাতিক শক্তির প্রতিযোগিতায় রূপ নিতে পারে বলেই আশঙ্কা প্রকাশ করছেন অনেক বিশেষজ্ঞ।



















