একের বিরুদ্ধে এক না সাজানো বিরোধিতা, ২০২৬-এর আগে বাংলার অঙ্ক

বাংলার (West Bengal) রাজনীতি কখনও সরল রেখায় এগোয় না। এখানে ক্ষমতার লড়াই চলে বহু স্তরে। দৃশ্যমান ময়দানে যেমন স্লোগান, সভা, মিছিল চলে, তেমনই অদৃশ্য স্তরে চলে হিসাব, ভয়, ...

By Kolkata24x7 Team

Published:

Follow Us
west-bengal-politics-2026-one-vs-one-opposition-analysis
Mehedi Hedayatulla
মেহেদি হেদায়েতুল্লা– বিশিষ্ট সাংবাদিক

বাংলার (West Bengal) রাজনীতি কখনও সরল রেখায় এগোয় না। এখানে ক্ষমতার লড়াই চলে বহু স্তরে। দৃশ্যমান ময়দানে যেমন স্লোগান, সভা, মিছিল চলে, তেমনই অদৃশ্য স্তরে চলে হিসাব, ভয়, সমঝোতা আর সময়ের অপেক্ষা। তাই ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের মুখে দাঁড়িয়ে যখন আবার ‘বাংলা দখল’-এর হুঙ্কার শোনা যাচ্ছে, তখন প্রশ্ন শুধু এটুকু নয়,কারা জিতবে। প্রশ্ন আরও গভীর, আদৌ কি কেউ বাংলার ক্ষমতার অঙ্ক বদলাতে চাইছে?

বাম আমল ও কংগ্রেসের ব্যর্থতা: দ্বৈত ক্ষমতার রাজনীতি

দীর্ঘ বাম আমলে বাংলার রাজনীতি ছিল এক অদ্ভুত দ্বৈত বাস্তবতায় বন্দি। রাজ্যে সিপিএমের অপ্রতিদ্বন্দ্বী আধিপত্য, আর কেন্দ্রে কংগ্রেসের শাসন। এই সময় প্রদেশ কংগ্রেস ছিল স্থায়ী বিরোধী, মুখে প্রতিবাদ, পথে মিছিল, কিন্তু ক্ষমতার কৌশলে কার্যত অনুপস্থিত।

   

গ্রাম থেকে শহর, কংগ্রেসের নীচুতলার কর্মীরা রাজনৈতিক নিগ্রহের শিকার হয়েছেন। কিন্তু সেই অত্যাচার কখনওই দিল্লির কংগ্রেস নেতৃত্বের রাজনৈতিক অগ্রাধিকারে পরিণত হয়নি। কেন্দ্রের ক্ষমতাকে ব্যবহার করে বাংলায় বামেদের বিরুদ্ধে সংগঠিত রাজনৈতিক আঘাত করা হয়নি। এই ব্যর্থতার মধ্যেই জমে ওঠে বিকল্প রাজনীতির প্রয়োজন।

এই বাস্তবতা সবচেয়ে স্পষ্ট ভাবে বুঝেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কংগ্রেসের ভিতরে থেকে নয়, কংগ্রেসের বাইরে গিয়ে লড়াই, এই সিদ্ধান্ত ছিল আবেগের নয়, দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার ফল।

২০১১: একের বিরুদ্ধে এক এবং পরিবর্তন

তৃণমূলের একলা লড়াই কখনওই বামফ্রন্টকে সরাতে পারত না। পরিবর্তনের রাস্তা খুলে দেয় কেন্দ্রীয় রাজনীতি। ইউপিএ সরকারের সঙ্গে সিপিএমের সম্পর্ক ভাঙতেই কেন্দ্রের কাছে সিপিএম হয়ে ওঠে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ। তখনই কার্যকর হয় বাংলার রাজনীতির পরীক্ষিত সূত্র, একের বিরুদ্ধে এক।

২০১১ সালের নির্বাচন তাই শুধু রাজ্যের ভোট ছিল না; ছিল কেন্দ্র–রাজ্য সংঘাতের ফল। ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটে। মানুষের মনে জন্ম নেয় এক মানসিক মুক্তি- “এবার কথা বলা যাবে।”

ক্ষমতায় এসে জোট ভাঙা: তৃণমূলের শাসনের রাজনীতি

কিন্তু প্রয়োজনের জোট দীর্ঘস্থায়ী হয় না। ক্ষমতায় এসেই তৃণমূল কেন্দ্রের কংগ্রেস জোট থেকে বেরিয়ে আসে। রাজ্যে কংগ্রেস ক্রমশ গুরুত্ব হারায়। আন্দোলনের রাজনীতি সরে গিয়ে জায়গা নেয় শাসনের রাজনীতি।

প্রশাসন, দল, সরকার, সব কিছু এক কেন্দ্রের চারপাশে প্রভাব বিস্তার হতে শুরু করে। এই কেন্দ্রীয় স্তরে একদিকে শাসনকে স্থিতিশীল করে, অন্যদিকে জন্ম দেয় জমে থাকা অসন্তোষ।

২০১৬: কংগ্রেস–সিপিএম জোট এবং তৃণমূলের অস্বস্তি

২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন বাংলার রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তুলনায় কম আলোচিত সন্ধিক্ষণ। এই প্রথম কংগ্রেস ও সিপিএম প্রকাশ্য জোটে লড়াই করে। ক্ষমতা বদলায়নি, কিন্তু রাজনীতির বার্তা ছিল স্পষ্ট।

এই জোট বিরোধী আসনে বসে। ফলাফলের পর থেকেই তৃণমূল শিবিরে এক ধরনের অস্বস্তি তৈরি হয়। কারণ ২০১৬ দেখিয়ে দিয়েছিল, একের বিরুদ্ধে এক হলে তৃণমূলও অজেয় নয়। তখন থেকেই রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে, এই জোট যদি আরও শক্তিশালী হয়, যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে ভবিষ্যতে কী হবে?

বিজেপির উত্থান: স্বাভাবিক না কি সুবিধাজনক?

এই প্রশ্নের মধ্যেই ধীরে ধীরে জায়গা করে নেয় বিজেপি। ২০১৬-র পর থেকেই বাম–কংগ্রেসের জায়গা দখল করে নেয় তারা প্রধান বিরোধী শক্তির আসন। এখানেই জন্ম নেয় এক বিতর্কিত কিন্তু বহুল চর্চিত প্রশ্ন, তৃণমূল কি বিজেপিকে ‘আমদানি’ করেছিল?

এই প্রশ্নের সরল উত্তর নেই। বিজেপির উত্থানের পেছনে জাতীয় রাজনীতি, কেন্দ্রীয় ক্ষমতা, সংগঠনের বিস্তার, সবই আছে। কিন্তু বাংলার প্রেক্ষাপটে একটি বাস্তবতা অনস্বীকার্য, বাম–কংগ্রেস জোট তৃণমূলের কাছে বাস্তব বিপদ ছিল, বিজেপি নয়।

বিজেপির সঙ্গে লড়াই তৃণমূলের পক্ষে তুলনামূলক সুবিধাজনক। ধর্মীয় মেরুকরণ যত বাড়ে, সংখ্যালঘু ভোট তত বেশি তৃণমূলের দিকে সংহত হয়। ফলে বিজেপি যত শক্তিশালী হয়, তত দুর্বল হয় বাম ও কংগ্রেস। এই কারণেই রাজনৈতিক মহলে ধারণা, বিজেপি বিরোধী শক্তি হলেও, তৃণমূলের কাছে ‘নিয়ন্ত্রিত বিরোধী’।

২০২১: হুঙ্কার ছিল, ক্ষমতা নয়

২০২১ সালে বিজেপি সর্বশক্তি নিয়ে মাঠে নামে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের লাগাতার সফর, আক্রমণাত্মক ভাষা, হেলিকপ্টার প্রচার,- সবই ছিল। কিন্তু ফলাফল ক্ষমতার মানচিত্র বদলায়নি।

এই ফলাফলের পর আরও জোরালো হয় ‘সেটিং–আনসেটিং’ তত্ত্ব। এই তত্ত্ব বলছে, কেন্দ্র আদতে চায় না মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পুরোপুরি সরাতে। সংঘাত থাকবে, কিন্তু সীমার মধ্যে।

এসআইআর বিতর্ক: ভোটার তালিকা না কি রাজনৈতিক অস্ত্র

এই রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেই নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে নির্বাচন কমিশনের এসআইআর প্রক্রিয়া ঘিরে। ভোটার তালিকা শুদ্ধিকরণের নামে নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য একাধিক নথি চাওয়াকে কেন্দ্র করে রাজ্য জুড়ে তৈরি হয়েছে আতঙ্ক ও ক্ষোভ।

অভিযোগ, বিশেষ করে সংখ্যালঘু, পরিযায়ী শ্রমজীবী ও প্রান্তিক মানুষ এই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি হয়রানির শিকার হচ্ছেন। জন্মসনদ, পিতা-মাতার নথি, বসবাসের একাধিক প্রমাণ, এই সব কাগজ বাংলার বাস্তবতায় বহু মানুষের কাছেই নেই। ফলে ভোটাধিকার হারানোর আশঙ্কা বাস্তব হয়ে উঠেছে।

এই ইস্যুতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়রানির অভিযোগ তুলে বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টে নিয়ে যান। নিজেই সওয়াল করেন। তাঁর বক্তব্য, ভোটার তালিকার নামে হয়রানি করছে কমিশন।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এসআইআর নিয়ে বিজেপির আগ্রাসন কার্যত বুমেরাং হয়ে ফিরছে। যে ইস্যু দিয়ে মেরুকরণ আরও তীব্র করার চেষ্টা হয়েছিল, সেটিই উল্টো ভাবে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। আর সেই ভয় থেকে জন্ম নিচ্ছে সংহতি- যার রাজনৈতিক ফসল তুলছে তৃণমূল।

এই প্রশ্নে শুধু সংখ্যালঘু সমাজ নয়, বহু বাঙালি হিন্দু ভোটারও অস্বস্তিতে। কারণ নাগরিকত্বের সন্দেহের তির যে কোনও দিন কার দিকে ঘুরে আসতে পারে, সেই আশঙ্কা এখন সর্বত্র।

তাই শুরু হয়েছে নতুন অঙ্ক কষা- এই এসআইআর বিতর্কে আসলে কার লাভ? অনেকের মতে, চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের পরেই বোঝা যাবে কে ফসল তুলল।

মেরুকরণ বনাম বাংলার সমাজ

বিজেপির রাজনীতির প্রধান অস্ত্র মেরুকরণ। শুভেন্দু অধিকারী-সহ একাধিক নেতা মুসলিম সম্প্রদায়কে নিশানা করে হিন্দু ভোট একত্র করার চেষ্টা করছেন। এই কৌশল কিছু ভোট বাড়াতে পারে, কিন্তু বাংলার সমাজ এমন নয়। এখানে ধর্মের পাশাপাশি ভাষা, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক স্মৃতি কাজ করে। এই মেরুকরণ রাজনীতি শেষ পর্যন্ত তৃণমূলকে সুবিধা দেয়।

সংখ্যালঘু রাজনীতি: হুমায়ুন না নওশাদ

এই প্রেক্ষাপটে সংখ্যালঘু রাজনীতির প্রশ্ন সামনে আসে। হুমায়ুন কবির রাজনৈতিক ভাবে আলোচিত হলেও শক্তিশালী নন। তৃণমূল থেকে বহিষ্কৃত হয়ে ধর্মীয় আবেগকে সামনে রেখে আলাদা দল গড়া প্রতীকী রাজনীতি। ভোট কাটতে পারেন, ভোট জেতার ক্ষমতা তাঁর নেই।

অন্য দিকে আইএসএফ নেতা ও বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকী তুলনামূলক ভাবে গ্রহণযোগ্য মুখ, লড়াকু, সুবক্তা, সংগঠক। তাঁর রাজনীতির কেন্দ্রে ধর্মীয় উত্তেজনা নয়, সংবিধান, অধিকার ও বঞ্চনার প্রশ্ন।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, বাংলার মুসলিম সমাজ অত্যন্ত বাঙালি। তারা জানে ধর্মীয় মেরুকরণের ফাঁদে পা দিলে রাজনৈতিক লাভ যায় অন্যের ঘরে।

২০২৬: আবার সেই পুরনো প্রশ্ন

২০২৬-এর নির্বাচন তাই বাংলার রাজনীতিকে আবার দাঁড় করিয়েছে সেই পুরনো প্রশ্নের সামনে, একের বিরুদ্ধে এক, না কি বহু মেরুর সুবিধা নেবে শাসক দল?

Kolkata24x7 Team

আমাদের প্রতিবেদন গুলি kolkata24x7 Team এর দ্বারা যাচাই করে লেখা হয়। আমরা একটি স্বাধীন প্ল্যাটফর্ম যা পাঠকদের জন্য স্পষ্ট এবং সঠিক খবর পৌঁছে দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমাদের লক্ষ্য এবং সাংবাদিকতার মান সম্পর্কে জানতে, অনুগ্রহ করে আমাদের About us এবং Editorial Policy পৃষ্ঠাগুলি পড়ুন।

Follow on Google