দেশ ভাগের ৭৫…পাকিস্তান ৭৫…বঙ্গভঙ্গের ৭৫

গৃহীত সংবিধানকে রাজনৈতিক আঘাত করার ফল মারাত্মক। হাড়ে হাড়ে বুঝছে পাকিস্তান

115

প্রসেনজিৎ চৌধুরী: পঁচাত্তর বছর আগে ব্রিটিশ ভূমি জরিপ আধিকারিক স্যার সিরিল ব়্যাডক্লিফ প্রবল গরমে হাঁসফাঁস করতে করতে, অত্যন্ত তড়িঘড়িতে যে ত্রুটিপূর্ণ সীমান্তরেখা এঁকেছিলেন সেই বিশ্বজোড়া আলোচিত দেশভাগ ইতিহাসের পঁচাত্তর বছর। 

হাজার হাজার যাত্রী নিয়ে শিয়ালদহ থেকে যেমন  রোজ খুলনা যাওয়ার মেল যেত, সেদিনও গেছিল। ১৪ আগস্ট, ১৯৪৭ খুলনা যাওয়ার মেল ট্রেন গেল ভিনদেশে-পাকিস্তানে। খুলনা থেকে ট্রেন এসেছিল শিয়ালদহে-ভারতে।

হাজার হাজার যাত্রী নিয়ে লাহোর থেকেও ট্রেন এসেছিলেন অমৃতসরে। জীবন বাঁচানোর তীব্র উতকণ্ঠা নিয়ে এই যাত্রীরা এলেন ভিনদেশে-ভারতে। উল্টো পথের যাত্রীরা গেলেন লাহোরে-পাকিস্তানে।

১৪ আগস্ট, ১৯৪৭ সাল অর্থাৎ ৭৫ বছর আগে ব়্যাডক্লিফ রেখা ধরে নির্দিষ্ট হয়ে গেছিল কয়েকটি ঐতিহাসিক সত্য। ভারত ভাগ। পাকিস্তান তৈরি। বাংলা ভাগ। পাঞ্জাব ভাগ। সীমান্ত রেখার দুপার থেকে ছিন্নমূল মানুষদের লোটাকম্বল নিয়ে নিশ্চিত আশ্রয়ের খোঁজ করা। কারোর গন্তব্য ভারত, কেউ যাচ্ছেন পাকিস্তান।

“…যদি ডাকি রক্তের নদীর থেকে কল্লোলিত হ’য়ে
ব’লে যাবে কাছে এসে, ‘ইয়াসিন আমি,
হানিফ মহম্মদ মকবুল করিম আজিজ—
আর তুমি?’ আমার বুকের ’পরে হাত রেখে মৃত মুখ থেকে
চোখ তুলে শুধাবে সে— রক্তনদী উদ্বেলিত হ’য়ে
বলে যাবে, ‘গগন, বিপিন, শশী…” (১৯৪৬-৪৭: জীবনানন্দ দাস)

এই পঁচাত্তুরে ইতিহাসের দিন জন্ম পাকিস্তানের। বিরাট ভারতের দুই অংশ কেটে ‘পূর্ব-পশ্চিম’ পাকিস্তান, যার একদিকের সঙ্গে অন্যদিকের যোজন যোজন দূরত্ব।  সেই দূরত্ব রেখেই টানা ২৪ বছর অখণ্ড ছিল পাকিস্তান। ১৯৭১ সালে প্রবল দমননীতি ও গণহত্যার মধ্যে দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানকে বশে আনার ব্যর্থ চেষ্টার পর রণে ভঙ্গ দিয়ে মাথা নামালেন পাক সামরিক কর্তারা। ৫০ বছর আগে ভেঙে গেছিল পাকিস্তান।  দ্বিখণ্ডিত পাকিস্তান পরে তাদের ঐতিহাসিক ভাঙনকে মেনে নিয়েছে।প্রতিবেশি দেশটির জন্মদিন, ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট।

বিশ্ব ইতিহাসের এই মহাপর্বে পাকিস্তানের জাতির জনক মহম্মদ আলি জিন্না (তৎকালীন গভর্নর জেনারেল) তাঁর দেশের গণপরিষদে দেওয়া প্রথম ভাষণে বলেছিলেন (তিনি ভাষণ দেন ১১ আগস্ট) “পাকিস্তানে জাতি ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিকের সমান অধিকার৷ ধর্মীয় অর্থে একজন হিন্দু বা মুসলিম হতে পারেন, তবে রাজনৈতিক অর্থে সকলেই পাকিস্তানের নাগরিক৷”

“…Only thin smoke without flame

From the heaps of couch-grass;

Yet this will go onward the same
Though Dynasties pass…”

(In Time of ‘The Breaking of Nations’: Thomas Hardy)

১৪ আগস্ট পাকিস্তান তৈরি হল। তারপর, পঁচাত্তরে পা রাখা দেশটির রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক পরিসরে ধর্মীয় আবেগ জিন্নার লক্ষ্যকে ধুলো চাটিয়ে ছেড়েছে। এই গত পঁচাত্তর বছরে পাকিস্তানের গণতন্ত্র (!) পরিপালিত হয়েছে সেনার অধীনে। গত ৭৫ বছরের প্রায় অর্ধেক সময় (৩৪ বছর)  সেনা শাসনের অধীনে। আবার নির্বাচন-ক্ষমতা দখলের মারপ্যাঁচে সেনা ঢুকেছে নিশ্চিন্তে। বকলমে পুরো পঁচাত্তর বছর ধরেই যেন সেনা নিয়ন্ত্রিত পাকিস্তান।

তীব্র ভারত বিরোধী ভূমিকা নিতে গিয়ে সরাসরি সংঘর্ষে একের পর এক পরাজয় পাকিস্তানকে জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠণের প্রক্রিয়া থেকে দূরে রাখার রাজনীতি-সেনা নীতি যে ভয়াবহ বিপর্যয়ে ফেলেছে, তাতে সন্ত্রাসবাদ পুষ্ট। আর সন্ত্রাসবাদের স্বাভাবিক চরিত্র যখন যেমন দরকার তখন তেমন ধর্মকে ব্যবহার করা। ফলে সন্ত্রাসবাদে রক্তাক্ত হয় পাক মসজিদের নমাজ আদায় স্থান। সুফি পীরের দরগা। আর ধর্মীয় বৈষম্যের কারণে সংখ্যালঘুররা হন আক্রান্ত। বৈষম্যের এই দিকটি ভারতেও অবধারিতভাবে বয়ে চলেছে।

পঁচাত্তর বছর আগে ভূমি রেখা বদলে দিয়েছিল বিশাল উপমহাদেশের ভূ-রাজনৈতিক চরিত্র। পাকিস্তানের জন্ম ইতিহাস-জন্মদিন যেন ইতিহাসকেই আঙুল তুলে বলে যাচ্ছে  সংবিধানকে বারবার আঘাত করার ফল কী হতে পারে।

পঁচাত্তরে পাকিস্তান।