কলকাতা: ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের সেই ৭২ ঘণ্টা গোটা বিশ্বের স্মৃতিতে আজও উজ্জ্বল। নেপালের রাজধানী কাঠমাণ্ডুতে পার্লামেন্ট ভবনে আগুন, প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে লুটপাট এবং সেনা কপ্টারে মন্ত্রীদের পালানোর দৃশ্য একই সঙ্গে ভয় এবং বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছিল। এই প্রবল গণবিক্ষোভের নেতৃত্বে ছিল নেপালের তরুণ প্রজন্ম বা ‘জেন-জেড’ (Gen Z)। আর এই গোটা আখ্যানের শেষে দেশের শাসনভার তুলে দেওয়া হয় ৭৩ বছর বয়সী প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি সুশীলা কার্কির কাঁধে। ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৫-এ তিনি নেপালের ৪২তম এবং প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।
যেভাবে জ্বলে উঠল প্রতিবাদের আগুন
নেপালে রাজনৈতিক অস্থিরতা নতুন কিছু নয়। ২০০৮ সালে রাজতন্ত্র বাতিলের পর ১৭ বছরে ১৪টি সরকার দেখেছে দেশ। দুর্নীতি এবং বেকারত্ব প্রায় ২০ শতাংশে পৌঁছেছিল। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ২,০০০ যুবক কাজের খোঁজে দেশ ছাড়ছিলেন।
এই পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ তারিখে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলির সরকার ডিজিটাল আইনের দোহাই দিয়ে ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক, ইউটিউব, হোয়াটসঅ্যাপ সহ ২৬টি সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম নিষিদ্ধ করে। এই নিষেধাজ্ঞাই বারুদে অগ্নিসংযোগের কাজ করে।
Read More: আমেরিকার ‘চোখ খুবলে নিল’ ইরান! কাতারে ধ্বংস ১.১ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন রাডার
পথে নামে পড়ুয়ারা: ৮ সেপ্টেম্বর সকালে স্কুলের ইউনিফর্ম পরা হাজার হাজার তরুণ কাঠমাণ্ডুর মাইতিঘর মণ্ডলায় জড়ো হয়ে পার্লামেন্ট ঘেরাওয়ের উদ্দেশ্যে এগিয়ে যায়। তাদের ক্ষোভ কেবল সোশ্যাল মিডিয়া বন্ধের বিরুদ্ধে ছিল না, বরং স্বজনপোষণ ও দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনৈতিক নেতাদের বিলাসবহুল জীবনযাপনের বিরুদ্ধেও ছিল।
রক্তক্ষয়ী সংঘাত: সরকার কঠোর হাতে এই বিক্ষোভ দমনের চেষ্টা করে। পুলিশের গুলিতে কাঠমাণ্ডুতেই ১৭ জন সহ দেশজুড়ে ৭০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয় এবং ২,০০০-এর বেশি মানুষ আহত হন।
কাঠমাণ্ডুতে আগুন: এই হত্যাকাণ্ডের পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। বিক্ষোভকারীরা পার্লামেন্ট ভবন, সুপ্রিম কোর্ট চত্বর এবং প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন সহ একাধিক সরকারি ভবনে আগুন ধরিয়ে দেয়।
ডিসকর্ড অ্যাপে ভোটাভুটি এবং ওলির পদত্যাগ Nepal Gen Z protests
৯ সেপ্টেম্বর সেনাপ্রধান জেনারেল অশোক রাজ সিগদেলের হস্তক্ষেপে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলি ইস্তফা দিতে বাধ্য হন। এরপরই এক অভূতপূর্ব ঘটনার সাক্ষী হয় বিশ্ব।
প্রতিবাদকারী সংগঠন ‘হামি নেপাল’ গেমারদের মেসেজিং অ্যাপ ‘ডিসকর্ড’ (Discord)-এ একটি ভার্চুয়াল সভার আয়োজন করে। দেশে ও বিদেশে থাকা প্রায় ১০,০০০ নেপালি নাগরিক সেখানে ভোট দিয়ে দেশের পরবর্তী নেতা নির্বাচন করেন। পাঁচজন প্রার্থীর মধ্যে থেকে উঠে আসে ৭৩ বছরের সুশীলা কার্কির নাম। জেন-জেড আন্দোলনকারীরা বয়সের পার্থক্য ভুলে তাঁর স্বচ্ছ ভাবমূর্তি এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন লড়াইয়ের ইতিহাসকেই প্রাধান্য দিয়েছিলেন।
কে এই সুশীলা কার্কি এবং তাঁর ভারত-যোগ
১৯৫২ সালে বিরাটনগরে জন্মগ্রহণ করা সুশীলা কার্কি নেপালের সুপ্রিম কোর্টের প্রথম মহিলা প্রধান বিচারপতি ছিলেন। বিচারব্যবস্থায় তাঁর সাহসিকতা এবং সততার সুনাম রয়েছে।
শিক্ষাজীবন: ১৯৭৫ সালে ভারতের বারাণসীর বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় (BHU) থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন তিনি।
ভারতের প্রতি অনুরাগ: ভারতের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগের কথা তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন। শপথ নেওয়ার আগে এক সাক্ষাৎকারে তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে সম্মান জানিয়ে হিন্দিতে বলেছিলেন, “ম্যায় মোদীজি কো নমস্কার করতি হুঁ।” বারাণসীতে গঙ্গার ধারের হস্টেলে কাটানো দিনগুলোর কথাও তিনি স্নেহের সঙ্গে স্মরণ করেন। কার্যভার গ্রহণের পর মোদীর সঙ্গে টেলিফোনিক আলাপেও দুই দেশের সম্পর্ক মজবুত করার বার্তা দেন তিনি।
বাংলাদেশের সঙ্গে তুলনা ও আগামীর পথ
নেপালের এই বিপ্লবের সঙ্গে বাংলাদেশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের বেশ কিছু মিল থাকলেও, পরবর্তী পদক্ষেপের ক্ষেত্রে বিস্তর ফারাক রয়েছে। বাংলাদেশে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর তাঁর দলকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং বিরোধী নেত্রী খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমান বর্তমানে দেশের প্রধানমন্ত্রী।
অন্যদিকে, নেপালে সুশীলা কার্কির সরকার অনেক বেশি সংযত ও মধ্যপন্থী পথ বেছে নিয়েছে। তিনি দেশে কোনও দলকে নিষিদ্ধ করেননি, বরং নিহতদের ‘শহিদ’ মর্যাদা দিয়ে একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দিকে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন। তাঁর স্পষ্ট বার্তা, “নৈরাজ্য কখনও সুখ আনতে পারে না। কেবল শান্তি এবং স্থিতিশীলতাই সমৃদ্ধির দরজা খুলতে পারে।” ২০২৬ সালের মার্চ মাসের এই নির্বাচনই প্রমাণ করবে জেন-জেড বিপ্লবের পর নেপালের এই গণতান্ত্রিক উত্তরণ কতটা সফল হলো।



















