টিঙ্কু মণ্ডল: বঙ্গের দোল উৎসব দেশের অন্যত্র ‘হোলি’ (Holi) নামে পরিচিত ৷ ‘হোলি’ শব্দটি এসেছে হোলিকা দহন থেকে৷ পুরাণ মতে ভগবান বিষ্ণুর বড় ভক্ত ছিল বালক প্রহ্লাদ ৷ তাঁর পিতা হিরণ্যকশিপু ছিলেন একজন অসুর এবং বিষ্ণুর বিরোধী। বিষ্ণুর ভক্ত হওয়ার কারণে পুত্র প্রহ্লাদকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয় হিরণ্যকশিপু । দাদা হিরণ্যকশিপুরের নির্দেশে প্রহ্লাদকে কোলে নিয়ে আগুনে বসে বোন হোলিকা৷
হোলিকা আগুনে না-পোড়ার বরপ্রাপ্ত ছিল ৷ কিন্তু প্রহ্লাদের ভক্তি ও নিজের আরাধ্যের প্রতি এতটাই বিশ্বাস ছিল যে, সে আগুনে বসেও একমনে বিষ্ণুর নাম জপ করতে থাকে ৷ কিন্তু অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে আগুনে বসায়, বরপ্রাপ্ত হওয়া সত্বেও হোলিকা ওই আগুনেই পুরে ছাই হয়ে যায় ৷ কিন্তু ভক্ত প্রহ্লাদ বেঁচে যায় ৷ এই ঘটনাই ‘হোলিকা দহন’ নামে পরিচিত। এই বিশ্বাস নিয়েই আজও মানুষ দোলের আগের দিন ‘হোলিকা দহন’ পালন করে থাকে ৷
অবাঙালিদের কাছে দোল মানে ‘হোলি’ বোঝায় ৷ শ্রীকৃষ্ণের জন্মভুমি মথুরাতে, রাধারানির জন্মভুমি বরসনাতে, নন্দলালার গোকুলে এবং ব্রজধাম বৃন্দাবনে সারা মাস ধরে বিভিন্ন রকমভাবে হোলি খেলা হয় ৷ এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, বরসনাতে লাড্ডুমার হোলি, নন্দগ্রামে লাঠ্মার হোলি, বৃন্দাবনে ফুলো কি হোলি, গোকুলে ছড়িমার হোলি, মথুরাতে হোলিকা দহন এবং রঙিন হোলি ৷ ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে হোলির ভিন্ন নাম ৷
* লাঠমার হোলি (নন্দগাঁও, উত্তরপ্রদেশ): মহিলারা পুরুষদের লাঠি দিয়ে পেটায় ৷ এটি হোলি উৎসবের এক ধরনের পরম্পরা, যেখানে মহিলারা পুরুষদের পিছু করে এবং লাঠি দিয়ে পেটায় ৷ মহিলাদের হাত থেকে রক্ষা পেতে পুরুষেরা ঢাল ব্যবহার করে থাকে ৷ এই পরম্পরাকে লঠমার হোলি বলে ৷ বরসানা ও নন্দগাঁওতে এই উৎসব খুব ধুমধাম করে পালন করা হয় ৷ কৃষ্ণ নন্দগাঁও থেকে বরসানা যেতেন রাধারানি এবং গোপিনীদের রঙ লাগাতে ৷ তখন রাধারানি ও বাকি গোপিনীরা কৃষ্ণ ও তাঁর সখাদের লাঠি নিয়ে তারা করতেন ৷ সেই থেকেই এই প্রথার প্রচলন শুরু হয় যা আজও অনেক ধুমধাম করে পালন করা হয় ৷
*লাড্ডুমার হোলি (বরসানা): হোলি মূলত রঙ দিয়ে খেলা হয় কিন্তু ব্রজবাসীরা লাড্ডু দিয়েও হোলি খেলেন ৷ এই উৎসবে নন্দগাঁওের লোকেরা বরসানার লোকেদের নিমন্ত্রণ করেন, যা ফাগ আমন্ত্রণ নামে পরিচিত ৷ এই হোলিতে মন্দিরে একে অপরের ওপর হলুদ রঙের বোঁদের লাড্ডু ছোঁরা হয়, কারণ হলুদ শ্রীকৃষ্ণের প্রিয় রঙ ৷ আজও এই প্রথা একইভাবে পালন করা হয় ৷
*ছড়িমার হোলি (গোকুল): শ্রীকৃষ্ণের ছোটবেলা কেটেছিল গোকুলে ৷ এখানে শ্রীকৃষ্ণের শিশুর রূপের মূর্তিকে দোলনাতে দোল খাইয়ে পুজো করা হয় ৷ এখানে ছোট ছোট (ছড়ি) মেয়েদের সঙ্গে দোল খেলা হয়, যা ছড়িমার হোলি নামে পরিচিত ৷ এই হোলি একাদশীর আগের দিন খেলা হয় ৷
*ফুলো কি হোলি (বৃন্দাবন উত্তরপ্রদেশ): বৃন্দাবনে রঙের বদলে ফুলের পাপড়ি দিয়ে এই হোলি খেলা হয় ৷ হোলির আগে একাদশীতে বৃন্দাবনের বাঁকে বিহারী মন্দিরে ফুলের পাপড়ি দিয়ে হোলি খেলা হয় ৷ মন্দিরের দরজা বিকেল ৪টের সময় খোলার সঙ্গে সঙ্গেই মন্দিরের পুরোহিত ভক্তদের ওপর ফুল ছোড়ে এবং তখনই ফুলের হোলি খেলা শুরু হয়ে যায় ৷ এই হোলি খেলা মাত্র 15-20 মিনিট ধরে খেলা হয় ৷ এই আয়োজন খুব কম সময়ের জন্য করা হয় ৷
*হোলা মহাল্লা (পঞ্জাব): পঞ্জাবের ওয়ারিয়র হোলি ‘হোলা মহল্লা’ নামেও কিন্তু পরিচিত ৷ শিখ নববর্ষের সূচনাকে এই হোলি চিহ্নিত করে ৷ এই হোলি কিন্তু বিশেষত শিখ সম্প্রদায় পালন করে থাকেন ৷ এটির সূচনা করেছিলেন দশম শিখ গুরু গোবিন্দ সিং ৷ এই হোলিতে কিন্তু কুস্তি, কলা, মক সোর্ড ফাইট, অ্যাক্রোবেটিক সামরিক অনুশীলন, ঘোড়সোয়ার, তলোয়ারবাজির প্রদর্শনী করা হয় ৷ এই দিন পাগড়ি বাঁধা বাধ্যতামূলক ৷ এই পরম্পরার মাধ্যমে তাঁরা রং খেলার সঙ্গে সাহস আর উৎসাহের পরিচয় দেয়।
*ফাগুয়া (বিহার): বিহারে হোলি ‘ফাগুয়া’ নামে পরিচিত ৷ হোলির আগের দিন সন্ধ্যেবেলা ‘হোলিকা দহন’ করা হয় ৷ পরের দিন সকাল থেকেই মানুষ একে অপরকে রং লাগিয়ে হোলি খেলে ৷ বিহারি লোকগীতির সঙ্গে এই ফাগুয়া উৎসব আরও সুন্দর হয়ে ওঠে ৷
*রঙ্গপঞ্চমী (মহারাষ্ট্র ও গুজরাত): মহারাষ্ট্র ও গুজরাতে হোলির পঞ্চম দিনে ‘রঙ্গপঞ্চমী’ উৎসব পালন করা হয় ৷ এই দিনে রাধা-কৃষ্ণের উপাসনা করা হয় এবং আবির ও রঙিন জল ছিটিয়ে রঙের উৎসব শেষ হয় ৷
*দোলযাত্রা (পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা ও অসম): দোল পূর্ণিমার আগের রাতে ‘নেড়াপোড়া’ বা ‘হোলিকা দহন’ পালিত হয়, যা অশুভ শক্তির বিনাশের প্রতীক। পশ্চিমবঙ্গে দোলের দিন সকালে প্রথমে রাধাকৃষ্ণের বিগ্রহে আবির দিয়ে পুজো করা হয় ৷ তারপর রাধা-কৃষ্ণের মূর্তিকে দোলায় চড়িয়ে কীর্তন গাইতে গাইতে এক জায়গা থেকে অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হয় ৷ এই কারণেই পশ্চিমবঙ্গে হোলিকে দোলযাত্রা বলা হয় ৷ শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রবর্তিত বসন্ত উৎসব বিশ্বজুড়ে পরিচিত ৷ এখানে গান, নাচ এবং আবির খেলার মাধ্যমে পালিত হয় বসন্ত উৎসব ৷ এছারাও মায়াপুরে ইস্কন মন্দিরে এই দোলযাত্রা খুব ধুমধাম করে পালন করা হয়।
*ইয়াওসাং (মণিপুর): মণিপুরে হোলি ‘ইয়াওসাং’ নামে পরিচিত ৷ ৬ দিন ধরে এই উৎসব পালন করা হয়। এই সময় যুব সমাজ হোলির সঙ্গে নিজেদের পরম্পরা অনুযায়ী কিছু খেলা খেলে এবং নাচ ও গানের মধ্যে দিয়ে উৎসব পালন করে থাকে ৷
*মঞ্জল কুলি (কেরল): হোলি কেরলে ‘মঞ্জল কুলি’ নামে পরিচিত। এর অর্থ হল হলুদ দিয়ে স্নান ৷ দোল পূর্ণিমার দিন দক্ষিণ ভারতের এই রাজ্যে বিশেষ করে কোঙ্কনি সম্প্রদায়ের লোকজন খুব ধুমধাম করে এই উৎসব পালন করে থাকে । চার দিন ধরে কেরলের মন্দিরে নাচ গানের সঙ্গে হলুদ জল দিয়ে হোলি খেলা হয়।
ভারতবর্ষে বিভিন্ন জাতি, বিভিন্ন ধর্ম ও ভাষার সমন্বয় দেখা যায় ৷ হোলি অন্যতম বিশেষ উৎসব ৷ এই উৎসবে সবাই নানারকম রঙের সমাহারে মেতে ওঠে ৷ এই উৎসবের মাধ্যমে সবাই রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলার আনন্দ উপভোগ করে ৷ আকাশ, বাতাস, প্রকৃতি নানা রঙে রঙিন হয়ে ওঠে ৷ রঘুবীরের হোলি খেলার মধ্যে দিয়েই সমগ্র দেশের মানুষ একে অপরের সঙ্গে দূরত্ব ভুলে গিয়ে আরও কাছাকাছি আসে। সবশেষে বলা যায়, এই উৎসব দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন নামে পরিচিত হলেও, এর মূল অর্থ হল আনন্দ, ভালোবাসা ও একতা।




















