মার্কিন-ইসরায়েল হামলায় কেন বিশ্বমঞ্চে নিঃসঙ্গ ইরান?

কলকাতা: মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি নিয়ে যখনই আলোচনা হয়, তখন একটি প্রশ্ন বারবার সামনে আসে (Iran)। আমেরিকা ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সংঘাতে কেন নিঃসঙ্গ ইরান। কেন অধিকাংশ মুসলিম রাষ্ট্র সরাসরি তার ...

By Sudipta Biswas

Published:

Follow Us
why-iran-stands-alone-against-us-israel-muslim-world

কলকাতা: মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি নিয়ে যখনই আলোচনা হয়, তখন একটি প্রশ্ন বারবার সামনে আসে (Iran)। আমেরিকা ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সংঘাতে কেন নিঃসঙ্গ ইরান। কেন অধিকাংশ মুসলিম রাষ্ট্র সরাসরি তার পাশে দাঁড়ায় না? সাম্প্রতিক উত্তেজনার আবহেও এই প্রশ্নটি নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে। এর উত্তর খুঁজতে গেলে ইতিহাস, ধর্মীয় বিভাজন এবং ভূরাজনীতির জটিল বাস্তবতার দিকে তাকাতে হয়।

১৯৭৯ সালের আগে পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তখন ইরান ছিল আমেরিকার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। দেশটির শাসক শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখতেন এবং ইসরায়েলের সঙ্গেও ইরানের নীরব কূটনৈতিক যোগাযোগ ছিল। কিন্তু ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লব সবকিছু পাল্টে দেয়।

   

আরও দেখুনঃ খামেনেই র মৃত্যমিছিল পিটিয়ে ছত্রভঙ্গ করল ভারতীয় সেনা

আয়াতুল্লাহ রুহোল্লাহ খামেনেই র নেতৃত্বে গড়ে ওঠা নতুন শাসনব্যবস্থা নিজেদের পরিচয় গড়ে তোলে তিনটি মূল আদর্শের ওপর। পশ্চিমা আধিপত্যের বিরোধিতা, ইসরায়েলের বৈধতা অস্বীকার এবং শিয়া ইসলামের রাজনৈতিক দর্শনের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনা। এই পরিবর্তনের ফলে আমেরিকা ও ইসরায়েলের প্রতি বিরোধিতা শুধু কূটনৈতিক নীতি নয়, বরং ইরানের রাষ্ট্রিক পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে।

ধর্মীয় বিভাজনও এই বাস্তবতাকে গভীর করেছে। ইরান মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় শিয়া মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ, যেখানে প্রায় ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ মানুষ শিয়া। অন্যদিকে বিশ্বের প্রায় ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ মুসলিম সুন্নি, এবং অধিকাংশ আরব দেশ যেমন সৌদি আরব, মিশর, জর্ডান সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠ।

সুন্নি-শিয়া বিভাজনের সূত্রপাত হয় ৬৩২ খ্রিস্টাব্দে মহানবী হজরত মুহাম্মদের মৃত্যুর পর নেতৃত্বের প্রশ্নে। সুন্নিরা মনে করতেন নেতৃত্ব যাবে যোগ্য সহচরের হাতে, আর শিয়াদের বিশ্বাস ছিল নেতৃত্ব থাকা উচিত নবীর পরিবারে, বিশেষ করে হজরত আলির হাতে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই রাজনৈতিক মতপার্থক্য ধীরে ধীরে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পার্থক্যে রূপ নেয়।

শিয়া রাজনৈতিক দর্শনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো ‘হিডেন ইমাম’ বা অন্তর্ধান করা দ্বাদশ ইমামের ধারণা। দ্বাদশী শিয়াদের বিশ্বাস, শেষ ইমাম গায়েব হয়ে গেছেন এবং ভবিষ্যতে মাহদী হিসেবে ফিরে আসবেন। এই বিশ্বাসের ফলে দীর্ঘদিন শিয়া আলেমরা সরাসরি রাজনৈতিক ক্ষমতা গ্রহণ থেকে দূরে ছিলেন।

কিন্তু ইসলামি বিপ্লবের পর আয়াতুল্লাহ খামেনেই ‘ভেলায়াত-ই ফকিহ’ বা ইসলামী ফকিহের অভিভাবকত্বের তত্ত্ব চালু করেন। এর ফলে ইরানে সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার হাতে রাজনৈতিক ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়। এই শাসনব্যবস্থা মুসলিম বিশ্বের অন্য কোনো সুন্নি রাষ্ট্রে নেই। ফলে রাজনৈতিক ও আদর্শগত দূরত্ব আরও বেড়ে যায়।

এখানেই শেষ নয়। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে আরেকটি বড় উপাদান হলো আঞ্চলিক ক্ষমতার প্রতিযোগিতা। ইরান নিজেকে শিয়া সম্প্রদায়ের রক্ষক হিসেবে তুলে ধরে এবং ইরাক, লেবানন বা ইয়েমেনের মতো দেশে শিয়া গোষ্ঠীগুলিকে সমর্থন করে। অন্যদিকে সৌদি আরবসহ অনেক সুন্নি রাষ্ট্র এটিকে নিজেদের নেতৃত্বের প্রতি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি সাংস্কৃতিক বাস্তবতা। ইরান আরব নয়; এটি পারস্য সভ্যতার উত্তরাধিকারী। তাদের ভাষা ফারসি, ইতিহাস ইসলাম-পূর্ব পারস্য সাম্রাজ্যের সঙ্গে যুক্ত। আরব বিশ্বের সঙ্গে এই সাংস্কৃতিক পার্থক্যও রাজনৈতিক দূরত্ব তৈরি করে। সবশেষে রয়েছে বাস্তব রাজনীতি। সৌদি আরব, জর্ডান বা মিশরের মতো বহু রাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে আমেরিকার সঙ্গে নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বে রয়েছে। অনেক দেশের জন্য ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা শাসনব্যবস্থার স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

ফলে বাস্তবে দেখা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের দ্বন্দ্ব কেবল ধর্মীয় নয়। এটি ধর্মীয় পরিচয়, আঞ্চলিক নেতৃত্বের লড়াই এবং আন্তর্জাতিক শক্তির সমীকরণের জটিল মিশ্রণ। আর সেই কারণেই বহু সময়ে সংঘাতে ইরানকে একাই লড়তে দেখা যায়, যদিও পুরো মুসলিম বিশ্ব একই বিশ্বাসের মানুষে ভরা।

Sudipta Biswas

Sudipta Biswas is a senior correspondent at Kolkata24x7, covering national affairs, politics and breaking news.