মাটি পেতে নিজের দেশে যাক, মুসলিমদের কড়া বার্তা জাপানি সাংসদের

জাপানে (Japan) মুসলিম কবরস্থানকে কেন্দ্র করে ফের বিতর্কের ঝড়। দেশটির পার্লামেন্টে সম্প্রতি এক তীব্র আলোচনার সময় মুসলিমদের উদ্দেশে কড়া মন্তব্য করে শোরগোল ফেলে দিয়েছেন শাসকদল লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির ...

By Sandipa Sil

Published:

Follow Us
japan-muslim-cemetery-controversy-lawmaker-mizuho-umemura-statement

জাপানে (Japan) মুসলিম কবরস্থানকে কেন্দ্র করে ফের বিতর্কের ঝড়। দেশটির পার্লামেন্টে সম্প্রতি এক তীব্র আলোচনার সময় মুসলিমদের উদ্দেশে কড়া মন্তব্য করে শোরগোল ফেলে দিয়েছেন শাসকদল লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সাংসদ মিজুহো উমেমুরা। তাঁর সাফ কথা—“জাপানে মাটি না পেলে মুসলিমদের নিজেদের দেশেই দাফন করা হোক।” এই মন্তব্যের পরই সোশ্যাল মিডিয়ায় শুরু হয়েছে ব্যাপক সমালোচনা ও উত্তপ্ত বিতর্ক।

প্রসঙ্গত, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মিয়াগি প্রিফেকচারের গভর্নর ইয়োশিহিরো মুরাই বহুদিনের আলোচিত মুসলিম কবরস্থান নির্মাণ প্রকল্পটি বাতিল করে দেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের ১০০ শতাংশ বিরোধিতা, উপযুক্ত জমির অভাব এবং জাপানের দীর্ঘদিনের শেষকৃত্য প্রথা—এই তিন কারণেই প্রকল্পটি চূড়ান্তভাবে প্রত্যাহার করা হয়। জাপানে শিন্তো-বৌদ্ধ ঐতিহ্যের প্রভাবে বর্তমানে প্রায় ৯৯.৯ শতাংশ মৃতদেহ দাহ করার রীতিতেই চলে। ফলে ভিন্ন ধর্ম বা দেশের নাগরিকদের জন্য পৃথকভাবে কবরস্থান তৈরি নিয়ে প্রশাসন বরাবরই সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।

   

এই প্রেক্ষিতেই ডায়েটের অধিবেশনে দাঁড়িয়ে মুসলিম দাফনপ্রথা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন উমেমুরা। ভাইরাল হওয়া সেই ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি সরাসরি সরকারি আধিকারিকদের জিজ্ঞেস করছেন—জাপানের ভূমিসংকুল পরিস্থিতিতে কি মুসলিমদের জন্য বিশেষ কবরস্থান তৈরি করা আদৌ যুক্তিযুক্ত? তাঁর বক্তব্য, “আমাদের দেশে জমি সীমিত। আমাদের সংস্কৃতি দাহ প্রথাকে অনুসরণ করে। যদি কেউ জাপানের রীতিনীতি মানতে না চান, তবে তাঁর দেহাবশেষ নিজের দেশেই পাঠানো হোক।”

এই মন্তব্যের সঙ্গে সঙ্গেই উত্তেজনা ছড়ায় রাজনৈতিক মহলে। যদিও উমেমুরার দাবি—তিনি ঘৃণা বা বিদ্বেষ ছড়াননি, বরং জাপানের সাংস্কৃতিক বাস্তবতা তুলে ধরেছেন। কিন্তু মানবাধিকার কর্মী ও প্রবাসী মুসলিম সংগঠনগুলি বলছে, এটি বৈষম্যমূলক আচরণের সামিল।

জাপানে মুসলিম জনসংখ্যা গত এক দশকে দ্রুত বেড়েছে। ২০১০ সালে যেখানে মুসলিমের সংখ্যা ছিল প্রায় ১ লক্ষ ১০ হাজার, সেখানে ২০২৩ সালে তা পৌঁছে যায় ৩ লক্ষ ৫০ হাজারে। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক ছাত্রছাত্রী, মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কর্মী, এবং প্রবাসী পরিবার—সব মিলিয়ে মুসলিম সম্প্রদায় এখন আর ক্ষুদ্র নয়। কিন্তু পুরো দেশে মুসলিমদের জন্য স্থায়ী কবরস্থানের সংখ্যা মাত্র দশের কাছাকাছি। ফলে মৃত্যুর পর দাফন নিয়ে বিপাকে পড়েন বহু পরিবার। অনেক ক্ষেত্রেই মরদেহ নিজ দেশে ফেরত পাঠাতেই বাধ্য হতে হয়।

মিয়াগি প্রিফেকচারের কবরস্থান বাতিল হওয়ার পর সেই অসুবিধা আরও প্রকট হয়েছে। মুসলিম সংগঠনগুলির দাবি—জাপান যদি শ্রমবাজারে বিদেশিদের গ্রহণ করে, তবে তাদের ধর্মীয় প্রয়োজনও সমানভাবে সম্মান করা উচিত। তাদের মতে, কবরস্থান নিয়ে আশঙ্কা বা ভুল তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। দাফনের পর মাটিতে কোনও দূষণ বা দুর্গন্ধ ছড়ায় না, তা বহু নথিতেই প্রমাণিত।

অন্যদিকে স্থানীয় মানুষের অভিযোগ—কবরস্থান হলে পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, জমির মূল্য কমতে পারে এবং সংস্কৃতিগত সংঘাত বাড়তে পারে। এই উদ্বেগকেই সামনে রেখে গভর্নর মুরাই প্রকল্প বাতিল করেছেন বলে প্রশাসনের বিবৃতি।

সমগ্র ঘটনা থেকে স্পষ্ট, জাপানে ধর্মীয় বৈচিত্র্য বাড়লেও বহিরাগত সংস্কৃতি গ্রহণ নিয়ে এখনো টানাপোড়েন প্রকট। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশটির দীর্ঘদিনের একরৈখিক সমাজ কাঠামো এখন বৈশ্বিক শ্রমচাহিদার চাপে বদলাতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে এই ধরনের বিতর্ক আরও বাড়তে পারে।

উমেমুরার বিতর্কিত মন্তব্য যেন সেই সাংস্কৃতিক সংঘাতেরই প্রতিফলন—জাপান কি নিজের ঐতিহ্য আঁকড়ে রাখবে, নাকি অভিবাসীদের ধর্মীয় অধিকারও সমান গুরুত্ব পাবে? প্রশ্নের উত্তর সময়ই দেবে। তবে আপাতত মুসলিম কবরস্থান বিতর্কে জাপানের সামাজিক-রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্ত হয়েই রয়েছে।

Sandipa Sil

আইনের ছাত্রী। শিক্ষানবীশ আইনজীবী। সাংবাদিকের সঙ্গে সংসারের সূত্রে সংবাদে আগ্রহ। কলকাতা24x7-এর মাধ্যমে পথ চলার শুরু।

Follow on Google