কলকাতা: ফুটেজটি মাত্র কয়েক সেকেন্ডের। কিন্তু তার ধ্বংসলীলার রেশ যেন কাটতে চাইছে না। আকাশের বুক চিরে ধেয়ে আসা এক আলোর ঝলকানি, আর তার পর মুহূর্তেই আগুনের গোলায় পরিণত হল দক্ষিণ ইরানের ছোট্ট শহর ল্যামার্ডের একটি অংশ। এটি কেবল যুদ্ধের আর পাঁচটা সাধারণ হামলার ঘটনা নয়। একাধিক সামরিক বিশ্লেষকের মতে, এই হামলায় সম্ভবত প্রথমবারের জন্য নিজেদের সর্বাধুনিক মিসাইল বা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ব্যবহার করেছে আমেরিকা।
অত্যাধুনিক এই অস্ত্রটির নাম ‘প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইল’ বা PrSM। সমরাস্ত্র প্রস্তুতকারী সংস্থা লকহিড মার্টিনের তৈরি এই নেক্সট-জেনারেশন মিসাইল সদ্য মার্কিন সেনাবাহিনীতে যুক্ত হয়েছে। যদিও মার্কিন সেনার তরফে এই হামলার বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও কোনও বিবৃতি দেওয়া হয়নি।
কী দেখা যাচ্ছে ফুটেজে? কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা?
ল্যামার্ড শহরের সিসিটিভি ফুটেজ, যা পরবর্তীকালে স্বাধীন বিশ্লেষকদের দ্বারা যাচাই করা হয়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে একটি আবাসিক এলাকার ওপর আছড়ে পড়ার ঠিক আগের মুহূর্তে এক ঘাতক প্রজেক্টাইল। ‘জেনস’ (Janes) এবং ‘ম্যাকেঞ্জি ইন্টেলিজেন্স’-এর মতো সংস্থার অস্ত্র বিশেষজ্ঞরা এই ফুটেজ বিশ্লেষণ করে মিসাইলের আকৃতি, এর গতিপথ এবং বিস্ফোরণের তীব্রতা নিয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করেছেন। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই মিসাইলে অন্যান্য সাধারণ মিসাইলের মতো দৃশ্যমান কোনও ‘কন্ট্রোল সারফেস’ বা নিয়ন্ত্রক অংশ ছিল না।
এই একটি তথ্যই মিসাইলটির ধরন সম্পর্কে অনেক কিছু স্পষ্ট করে দেয়। জেনস-এর বিশ্লেষক অ্যামায়েল কোটলারস্কি জানিয়েছেন, সম্ভাব্য মার্কিন উৎক্ষেপণ কেন্দ্র থেকে ল্যামার্ডের দূরত্ব এবং মিসাইলের গতিপথ বিচার করলে, ওই পরিস্থিতিতে হামলা চালানোর ক্ষমতা একমাত্র PrSM-এরই রয়েছে। যদিও মার্কিন সেনাবাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) এই বিষয়ে কোনও মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
নিশানায় কি ভুল? প্রাণ গেল শিশুদেরও
এই হামলার ভয়াবহতা সাধারণ মানুষের প্রাণহানির পরিসংখ্যান থেকেই স্পষ্ট। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, প্রায় একই সময়ে হওয়া দু’টি হামলায় অন্তত ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে। একটি আছড়ে পড়ে আবাসিক ভবনে এবং অন্যটি প্রায় ৩০০ মিটার দূরে একটি স্পোর্টস হলে। ওই স্পোর্টস হলটি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনেরই অংশ ছিল, যেখানে স্থানীয় শিশু ও পড়ুয়ারা খেলতে যেত।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে ১২ বছরের এক কিশোরীও রয়েছে, যে প্রতিদিনের মতো সেদিনও ভলিবল প্র্যাকটিসের জন্য একটু আগেই সেখানে পৌঁছেছিল। হামলায় মৃত সর্বকনিষ্ঠ শিশুটির বয়স মাত্র দু’বছর। তবে এই হামলার প্রকৃত লক্ষ্য কী ছিল, তা নিয়ে ধন্দ রয়েছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, ওই এলাকার কাছাকাছি ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস (IRGC)-এর একটি ঘাঁটি থাকতে পারে। তবে উপগ্রহ চিত্রে এমন কোনও ঘাঁটির ক্ষয়ক্ষতির স্পষ্ট প্রমাণ এখনও মেলেনি।
নয়া মার্কিন মিসাইলের আত্মপ্রকাশ?
যদি এই জল্পনা সত্যি হয়, তবে ল্যামার্ডের হামলাই হবে যুদ্ধক্ষেত্রে PrSM-এর প্রথম ব্যবহার। এই মিসাইলটি মূলত ATACMS-এর উত্তরসূরি হিসেবে তৈরি করা হয়েছে, যার পাল্লা প্রায় ৫০০ কিলোমিটার পর্যন্ত প্রসারিত। এর নির্ভুলভাবে আঘাত হানার ক্ষমতাও অনেক বেশি।
মার্কিন জয়েন্ট চিফস অফ স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন চলতি মাসের শুরুতে উন্নত প্রযুক্তির অস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে ইতিহাস তৈরির ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। ইতিমধ্যেই লকহিড মার্টিন এই মিসাইলের উৎপাদন বহুগুণ বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে এবং মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতরও তাতে সম্মতি জানিয়েছে।
যুদ্ধের এক নতুন পর্যায়
ল্যামার্ডের হামলা কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মিনাব (Minab) এলাকায় আরেকটি হামলার খবর পাওয়া যায়, যেখানে একটি স্কুলে আঘাত হানার অভিযোগ তোলে ইরান। আমেরিকা জানিয়েছে তারা বিষয়টি তদন্ত করে দেখছে, তবে তারা কখনই সাধারণ মানুষের বাসস্থানে হামলা চালায় না বলে দাবি করেছে পেন্টাগন।
এই হামলার ধরন ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, আমেরিকা এখন দূরপাল্লার ‘ডিপ-স্ট্রাইক’ ক্ষমতা ব্যবহার করে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুগুলোতে আঘাত হানার কৌশল নিয়েছে। ল্যামার্ডের মতো দুর্গম এবং প্রত্যন্ত শহরগুলোও এখন তাদের মিসাইলের আওতায় চলে এসেছে।
সামরিক কর্তাদের কাছে PrSM হয়তো প্রযুক্তিগত এক বিরাট লাফ। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে এর অর্থ কেবলই ধ্বংস এবং মৃত্যু। যদি এটি সত্যিই PrSM-এর প্রথম ব্যবহার হয়ে থাকে, তবে ইরান-মার্কিন সংঘাত যে এক নতুন ও ভয়ংকর পর্যায়ে প্রবেশ করল, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।



















