ওয়াশিংটন/তেহরান: সুইজারল্যান্ডে দু’পক্ষের মধ্যে হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তি বা সমঝোতাপত্র (MoU) স্বাক্ষর হওয়ার পর ফের মুখোমুখি সংঘাতে জড়াল আমেরিকা ও ইরান। শুক্রবার ইরানের অভ্যন্তরে একাধিক সামরিক ঘাঁটিতে তীব্র বিমান হামলা চালাল মার্কিন ফৌজ। আমেরিকার অভিযোগ, আন্তর্জাতিক জলসীমায় একটি বাণিজ্যিক পণ্যবাহী জাহাজে ড্রোন হামলা চালিয়েছিল ইরান, যার জবাবেই এই নিখুঁত এয়ারস্ট্রাইক চালানো হয়েছে। এই ঘটনার পর পাল্টা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলিকে নিশানা করে রকেট ও ড্রোন হামলা শুরু করেছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারী গার্ড কর্পস (IRGC)। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে এক পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দামামা বেজে উঠল। (US launches airstrikes on Iran after drone attack)
হামলার আগে ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি
মার্কিন সামরিক অভিযানের মাত্র কয়েক মিনিট আগেই আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ইরানে প্রত্যাঘাতের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। আমেরিকা পাল্টা হামলা চালাবে কি না, সাংবাদিকদের এই প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প রহস্যজনক হেসে বলেছিলেন, “আপনারা খুব দ্রুতই তা জানতে পারবেন।”
এর ঠিক পরেই মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) ঘোষণা করে যে, মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলি ইরানের অভ্যন্তরে নিখুঁত হামলা (Precision Strikes) চালিয়েছে। সেন্ট্রাল কমান্ডের দাবি, গত ২৫ জুন ওমান উপকূলের কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজ ‘এম/ভি এভার লাভলি’-তে (M/V Ever Lovely) আত্মঘাতী ড্রোন হামলা চালায় ইরান। তারই জবাবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন মজুত রাখার গুদাম এবং উপকূলীয় রাডার স্টেশনগুলি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এই হামলাকে ‘অযাচিত আগ্রাসন’ বলে আখ্যা দিয়েছে মার্কিন সেনা।
‘হিংসার জবাব হিংসাতেই’, বার্তা উপ-রাষ্ট্রপতি জেডি ভ্যান্সের
এই সামরিক সংঘাতের কয়েক ঘণ্টা পরেই এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেলে ইরানকে কড়া ভাষায় হুঁশিয়ারি দেন মার্কিন উপ-রাষ্ট্রপতি জেডি ভ্যান্স। তিনি লেখেন, “ইরান যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল। আমরা তা মেনে চলেছি। চুক্তি প্রয়োগ নিয়ে যদি ওদের কোনও দ্বিমত থাকত, তবে ওরা ফোনে কথা বলতে পারত। কিন্তু মনে রাখা উচিত, হিংসার জবাব হিংসা দিয়েই দেওয়া হবে।” অন্যদিকে, ট্রাম্প এই ড্রোন হামলাকে যুদ্ধবিরতি চুক্তির ‘মূর্খামিভরা লঙ্ঘন’ বলে অভিহিত করেছেন।
কাঁপল ইরানের সিরিক বন্দর, হাই-অ্যালার্টে হরমুজ প্রণালী
মার্কিন হামলার পর ইরানের সংবাদমাধ্যমগুলি জানিয়েছে, দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দর শহর সিরিকের (Sirik) একটি জেটির কাছাকাছি এলাকায় শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র আছড়ে পড়েছে। রয়টার্সের রিপোর্ট অনুযায়ী, হামলার পরই সিটিক টাওয়ার ও সংলগ্ন এলাকায় ব্যাপক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং সাধারণ মানুষকে ছবি তুলতে বাধা দেওয়া হচ্ছে।
বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (LNG) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সরবরাহ করা হয় এই সংকীর্ণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে। ফলে এই এলাকায় নতুন করে উত্তেজনা ছড়াতেই বিশ্ব বাজারে জ্বালানি তেলের দাম নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইতিমধ্যেই হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াত করা বিদেশি তেল ট্যাঙ্কারগুলিকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান।
লেবানন-ইজরায়েল চুক্তি এবং হিজবুল্লার প্রত্যাখ্যান
উপকূলীয় এই উত্তেজনার মাঝেই মধ্যপ্রাচ্যে অন্য একটি কূটনৈতিক মোড় দেখা গিয়েছে। ইজরায়েল এবং লেবানন আমেরিকার মধ্যস্থতায় হিজবুল্লা গোষ্ঠীর সঙ্গে শত্রুতা অবসানের লক্ষ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যেখানে হিজবুল্লার নিরস্ত্রীকরণ এবং দক্ষিণ লেবানন থেকে ইজরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের কথা বলা হয়েছে। তবে ইরান সমর্থিত হিজবুল্লা গোষ্ঠী ইতিমধ্যেই এই চুক্তিকে প্রত্যাখ্যান করে সাফ জানিয়েছে, তারা এই শর্ত মানবে না।



