
ওয়াশিংটন: আমেরিকা, ইজরায়েল এবং ইরানের মধ্যে চলা রক্তক্ষয়ী সংঘাতের মাঝেই এবার সরাসরি তেহরানের ‘তেল-ভাণ্ডারে’ চোখ দিল ওয়াশিংটন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিলেন, “ইরানের তেল নেওয়াই আমার সবচেয়ে পছন্দের কাজ।” আর তাঁর এই মন্তব্যের পরেই বিশ্বজুড়ে শুরু হয়েছে জোর জল্পনা।
কয়েক মাস আগেই ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে, ভেনেজুয়েলার তেলের দখল নিয়েছে আমেরিকা এবং কিউবাতেও একই রকম চেষ্টা চলছে। এবার তাঁর নিশানায় ইরানের খর্গ দ্বীপ, যেখান থেকে তেহরান তাদের মোট তেলের প্রায় ৯০ শতাংশ রফতানি করে।
বিশ্বজুড়ে চরম জ্বালানি সঙ্কট
যুদ্ধ পরিস্থিতির জেরে খর্গ দ্বীপে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে এবং বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান ট্রানজিট হাব ‘হরমুজ প্রণালী’ অবরুদ্ধ হয়ে রয়েছে। এর জেরে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এই অবস্থায় তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে বাধ্য হয়েই মার্কিন প্রশাসন সাময়িকভাবে ইরানের তেলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছে। আগামী ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত সমুদ্রে আটকে থাকা প্রায় ১৪ কোটি (১৪০ মিলিয়ন) ব্যারেল তেল বিক্রির অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
কেন ট্রাম্পের নজর ইরানের তেলে? Trump Iran Oil Strategy
ইরানের তেল-ভাণ্ডার এবং রফতানির অঙ্কের দিকে চোখ রাখলেই আমেরিকার এই আগ্রহের কারণ স্পষ্ট হবে৷ ইরানের কাছে আনুমানিক ২০৮.৬ বিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের মজুত রয়েছে, যা বিশ্বের মোট মজুতের প্রায় ১২ শতাংশ এবং বিশ্বে তৃতীয় সর্বোচ্চ। রফতানি না করে শুধু নিজেদের মজুতের ওপর নির্ভর করলে আগামী ২৯০ বছর ইরানের তেলের অভাব হবে না।
ইরান বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ৩০ থেকে ৪৫ লক্ষ (৩-৪.৫ মিলিয়ন) ব্যারেল তেল উৎপাদন করে, যা বিশ্বব্যাপী সরবরাহের ৪-৫ শতাংশ।
নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও কতটা তেল রফতানি করে ইরান?
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কড়া নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ২০২৫-২৬ সালে ইরান প্রতিদিন প্রায় ১১ থেকে ১৫ লক্ষ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রফতানি করতে সক্ষম হয়েছে। পরোক্ষ শিপিং নেটওয়ার্ক এবং ডিসকাউন্টের মাধ্যমে তারা এই ধারা বজায় রেখেছে। পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম যুক্ত করলে এই রফতানির পরিমাণ দিনে ২০ থেকে ২৪ লক্ষ ব্যারেলে পৌঁছায়।
সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হল, ইরানের এই তেলের ৮০-৯০ শতাংশই কেনে চিন (China)। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়াতে তেহরান যে পুরোপুরি প্রাচ্যের দিকে ঝুঁকেছে, এটি তারই প্রমাণ।
খর্গ দ্বীপ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
খর্গ দ্বীপ নিছক কোনও টার্মিনাল নয়, এটি আক্ষরিক অর্থেই ইরানের তেলের লাইফলাইন। ইরানের অপরিশোধিত তেল রফতানির ৯০-৯৪ শতাংশই এই একটি মাত্র দ্বীপের মাধ্যমে হয়। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে এখান থেকে প্রতিদিন ১৩ থেকে ১৬ লক্ষ ব্যারেল তেল রফতানি হয়। দ্বীপটির পরিকাঠামো এতটাই উন্নত যে, এটি প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৭০ লক্ষ ব্যারেল পর্যন্ত তেল লোড করতে সক্ষম।
খর্গ দ্বীপ নিয়ে কী ছক কষছেন ট্রাম্প?
ট্রাম্পের খর্গ দ্বীপ দখলের ভাবনাটি নিছক কোনও রাজনৈতিক বয়ান নয়। একাধিক সাক্ষাৎকারে তিনি খোলাখুলি বলেছেন যে, খর্গ দ্বীপ দখলের বিষয়টি তাঁদের পরিকল্পনায় রয়েছে।
সামরিক স্তরেও এর প্রস্তুতি চলছে বলে খবর। পেন্টাগন ইতিমধ্যেই খর্গ দ্বীপের মতো কৌশলগত স্থানগুলি দখলের জন্য ‘কন্টিনজেন্সি প্ল্যান’ বা আপৎকালীন ছক তৈরি করেছে। সেই সঙ্গে ওই অঞ্চলে হাজার হাজার মার্কিন সেনাও মোতায়েন করা হচ্ছে। খর্গ দ্বীপের দখল নিতে পারলে ইরানের অর্থনীতির টুঁটি চেপে ধরা আমেরিকার পক্ষে অনেক সহজ হবে। এখন গোটা বিশ্বের তেল বাজারের নজর ট্রাম্পের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।

