ভারতের চৌকাঠ পেরনোর স্পর্ধা! চিনা ‘হাঙ্গর’ নিয়ে বঙ্গোপসাগরে ছক কষছে পাকিস্তান

নয়াদিল্লি: ১৯৭১ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে ভারতীয় নৌবাহিনীর রণতরী আইএনএস খুকরি (INS Khukri)-কে আরব সাগরে ডুবিয়ে দিয়েছিল পাকিস্তানের সাবমেরিন পিএনএস হাঙ্গর (PNS Hangor)। যদিও সেই যুদ্ধে…

নয়াদিল্লি: ১৯৭১ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে ভারতীয় নৌবাহিনীর রণতরী আইএনএস খুকরি (INS Khukri)-কে আরব সাগরে ডুবিয়ে দিয়েছিল পাকিস্তানের সাবমেরিন পিএনএস হাঙ্গর (PNS Hangor)। যদিও সেই যুদ্ধে পাকিস্তানের শোচনীয় পরাজয় এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতাই শেষ কথা ছিল। কিন্তু দীর্ঘ ৫৫ বছর পর ফের একবার খবরের শিরোনামে সেই ‘হাঙ্গর’। সম্প্রতি চিনে তৈরি অত্যাধুনিক ‘হাঙ্গর-ক্লাস’ সাবমেরিন পাকিস্তানের করাচি বন্দরে এসে পৌঁছেছে। আর এই অত্যাধুনিক ডুবোজাহাজ হাতে পেয়েই এবার সোজা বঙ্গোপসাগরে (Bay of Bengal) নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের ছক কষতে শুরু করেছে ইসলামাবাদ। (Pakistan Hangor-class submarine Bay of Bengal)

বঙ্গোপসাগরে পাকিস্তানের নতুন ব্লু-প্রিন্ট

গত এপ্রিলে চিনে আনুষ্ঠানিকভাবে নৌবহরে যুক্ত হওয়ার পর, সম্প্রতি প্রথম হাঙ্গর-ক্লাস সাবমেরিনটি করাচিতে পৌঁছয়। এই সাবমেরিনকে পাহারায় থাকা নৌবহরের কম্যান্ডার, কমোডোর ওমর ফারুক দেশে ফেরার পথে শ্রীলঙ্কায় দাঁড়িয়ে এক তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। তাঁর দাবি, এই নতুন সাবমেরিনের সাহায্যে পাকিস্তান এবার নিজেদের চেনা আরব সাগরের গণ্ডি পেরিয়ে বঙ্গোপসাগরেও দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি বজায় রাখতে সক্ষম হবে। ফারুক এই ডুবোজাহাজকে ‘গেম চেঞ্জার’ বলে উল্লেখ করেছেন। কমোডোর ওমর ফারুক বলেন, “নতুন হাঙ্গর সাবমেরিনের অন্তর্ভুক্তি বঙ্গোপসাগরের মতো দূরবর্তী অঞ্চলে পাকিস্তানের নৌ-উপস্থিতি বজায় রাখতে ব্যাপকভাবে সাহায্য করবে।”

   

কী এই হাঙ্গর-ক্লাস সাবমেরিন?

পাকিস্তানের নৌবাহিনীর আধুনিকীকরণের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হল এই ডুবোজাহাজ। পুরোনো ‘আগোস্তা’ সাবমেরিনগুলিকে বাতিল করে এই নতুন চিনা সাবমেরিন আনছে ইসলামাবাদ। চিনের সাহায্যে মোট ৮টি হাঙ্গর-ক্লাস সাবমেরিন নৌবহরে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে পাকিস্তানের। এই সাবমেরিনগুলি ‘এয়ার-ইন্ডিপেন্ডেন্ট প্রোপালশন’ (AIP) প্রযুক্তিতে তৈরি।

ফলে প্রচলিত ডিজেল-ইলেকট্রিক সাবমেরিনের মতো ব্যাটারি রিচার্জ করার জন্য এদের বারবার জলের ওপরে ভাসতে হয় না। দীর্ঘক্ষণ জলের তলায় লুকিয়ে থাকতে সক্ষম হওয়ায় এদের ট্র্যাক করা অত্যন্ত কঠিন।

বাংলাদেশের সঙ্গে গভীর হচ্ছে সামরিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক

পাকিস্তানের এই বঙ্গোপসাগর-স্বপ্নের নেপথ্যে অন্যতম বড় কারণ হল বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের সাম্প্রতিক ঘনিষ্ঠতা। ২০২৪ সালে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন জমানায় ঢাকা ও ইসলামাবাদের মধ্যে সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করে। ঢাকা-করাচি সরাসরি বিমান চলাচল শুরু হয়।

২০২৪ সালের অগাস্ট থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ২৭% বৃদ্ধি পায় এবং ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ তা আরও বাড়ে।

গত বছরের (২০২৫) নভেম্বরে প্রথমবার পাকিস্তানের যুদ্ধজাহাজ ‘পিএনএস সইফ’ চারদিনের জন্য চট্টগ্রামের বন্দরে নোঙর করেছিল, যা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর প্রথম।

চলতি বছরের (২০২৬) জানুয়ারিতে বাংলাদেশের বিমানবাহিনীর প্রধান পাকিস্তান সফর করেন এবং দুই দেশের বাহিনী ‘আমান-২৫’ নৌ-মহড়ায় অংশ নেয়।

তবে, গত ফেব্রুয়ারি মাসে তারেক রহমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ভারতের সঙ্গেও ঢাকার সম্পর্কের নতুন উষ্ণতা দেখা গিয়েছে, যা এই ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ভারতের অবস্থান ও নিরাপত্তা

আন্তর্জাতিক জলসীমায় যেকোনো দেশের সামরিক নৌযান চলাচলের অধিকার থাকলেও, বঙ্গোপসাগর ঐতিহ্যগতভাবেই ভারতের কৌশলগত ফ্রন্ট ইয়ার্ড বা বাড়ির উঠোন। এখানে ভারতের ইস্টার্ন নেভাল কম্যান্ড অবস্থিত, যা আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নজরমিনার।

যদিও পাকিস্তান পুরোনো ‘হাঙ্গর’ নামটিকে ফিরিয়ে এনে একটি মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরির চেষ্টা করছে, কিন্তু ১৯৭১ সালের তুলনায় বর্তমান ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। বর্তমানে ভারতীয় নৌবাহিনীর কাছে পরমাণু শক্তিচালিত সাবমেরিন, দুটি বিমানবাহী রণতরী এবং দূরপাল্লার শক্তিশালী নজরদারি ব্যবস্থা রয়েছে। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, বঙ্গোপসাগরে পাকিস্তানের এই উপস্থিতি ভারতের কাছে একটি ‘বিরক্তিকর’ বিষয় (irritant) হলেও, নৌ-আধিপত্যে ভারতের যে বিপুল শক্তি রয়েছে, তাতে এই অঞ্চলে ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তন করার মতো সামর্থ্য ইসলামাবাদের নেই।