‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দিয়ে মসজিদের মাইক খোলা ঘিরে উত্তেজনা

নেপালের একটি হিন্দু-প্রধান দেশে বিরল সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার ছবি সামনে এসেছে। গত ৭ জানুয়ারি, ২০২৬ তারিখে নেপালের কাতোরিয়া এলাকায় একটি মসজিদের মিনারে উঠে লাউডস্পিকার বা মাইক…

nepal-mosque-mic-removed-jai-shri-ram-slogan-tension

নেপালের একটি হিন্দু-প্রধান দেশে বিরল সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার ছবি সামনে এসেছে। গত ৭ জানুয়ারি, ২০২৬ তারিখে নেপালের কাতোরিয়া এলাকায় একটি মসজিদের মিনারে উঠে লাউডস্পিকার বা মাইক খুলে ফেলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে তীব্র উত্তেজনা ছড়ায়। ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, রাতের অন্ধকারে একদল মানুষ ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দিতে দিতে মসজিদের মিনারে উঠছে এবং সেখান থেকে মাইক নামিয়ে আনছে। এই ঘটনার সত্যতা একাধিক আন্তর্জাতিক ও দক্ষিণ এশীয় সংবাদমাধ্যম নিশ্চিত করেছে।

Advertisements

স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, ওই মসজিদ থেকে দিনে পাঁচবার আজানের জন্য ব্যবহৃত মাইকের শব্দ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই এলাকাবাসীর একাংশের মধ্যে অসন্তোষ ছিল। অভিযোগ, গভীর রাত ও ভোরের সময় উচ্চ শব্দে আজান দেওয়ায় শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষদের সমস্যা হচ্ছিল। সেই অভিযোগ প্রশাসনের কাছেও জানানো হয়েছিল বলে দাবি। তবে সমস্যার স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় ক্ষোভ জমতে থাকে, যার পরিণতিতেই এই ঘটনা ঘটে বলে স্থানীয়দের একাংশের বক্তব্য।

   

অন্যদিকে মুসলিম সম্প্রদায়ের দাবি, কোনও আলোচনা বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ছাড়াই ধর্মীয় স্থাপনার উপর এই ধরনের হামলা সরাসরি উসকানিমূলক ও বেআইনি। তাঁদের মতে, এটি শুধুই শব্দ দূষণের অভিযোগ নয়, বরং ধর্মীয় বিদ্বেষ থেকেই এই ঘটনা ঘটানো হয়েছে। ঘটনার পরপরই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে বচসা শুরু হয়, যা ধীরে ধীরে বিক্ষোভে রূপ নেয়।

পরিস্থিতি যাতে নিয়ন্ত্রণের বাইরে না যায়, সে জন্য নিকটবর্তী সীমান্ত শহর বিরগঞ্জে কার্ফু জারি করে নেপাল প্রশাসন। অতিরিক্ত পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়। প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখাই এখন প্রধান লক্ষ্য এবং কোনও পক্ষই আইন নিজের হাতে তুলে নিতে পারবে না।

এই ঘটনার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এক্স (সাবেক টুইটার)-এ পোস্টটি কয়েক হাজার লাইক পেয়েছে। সেখানে কিছু হিন্দুত্ববাদী অ্যাকাউন্ট ঘটনাটিকে সমর্থন করে ভারতে এমন পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। আবার অনেকেই এই ঘটনাকে ভাঙচুর ও আইনবিরোধী কাজ বলে কড়া সমালোচনা করেছেন। তাঁদের দাবি, নেপালের দণ্ডবিধি অনুযায়ী ধর্মীয় স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নেপাল সাধারণত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য পরিচিত। হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হলেও মুসলিম, বৌদ্ধ ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষ দীর্ঘদিন শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে বসবাস করে আসছেন। ফলে এই ধরনের ঘটনা উদ্বেগজনক এবং ভবিষ্যতে বড় সমস্যার ইঙ্গিত দিতে পারে বলে মত তাঁদের।

আইনবিদদের একাংশের বক্তব্য, শব্দ দূষণ নিয়ে অভিযোগ থাকলে তার সমাধান প্রশাসনিক ও আইনি পথেই হওয়া উচিত। কোনও ধর্মীয় স্থাপনার উপর দলবদ্ধভাবে চড়াও হওয়া বা স্লোগান দিয়ে উসকানি দেওয়া পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। এতে সংবিধানস্বীকৃত ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং সামাজিক শান্তি—দু’টিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এই মুহূর্তে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকলেও প্রশাসন সতর্ক। উভয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা চালানো হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে। কাতোরিয়া ও বিরগঞ্জের মানুষ এখন তাকিয়ে আছেন, এই উত্তেজনা আদৌ প্রশমিত হয় কি না এবং নেপালের দীর্ঘদিনের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আবার স্বাভাবিক পথে ফিরবে কি না, সেদিকেই।

Advertisements