মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যেই ইরান তার ‘খাইবার-শেকান’ (Kheibar Shekan) ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে শত্রুপক্ষের লক্ষ্যবস্তুতে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে; এই ক্ষেপণাস্ত্রটিকে দেশটির সবচেয়ে আধুনিক ও নিখুঁত নিশানায় আঘাত হানতে সক্ষম (প্রিসিশন-গাইডেড) অস্ত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ইরানি সংবাদমাধ্যম ও রেভল্যুশনারি গার্ডস (আইআরজিসি)-এর দাবি অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সংঘাতের সময় পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে এই বিধ্বংসী খাইবার-শেকান ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর একটি বড় বহর নিক্ষেপ করা হয়েছিল।
আইআরজিসি (IRGC) দাবি করেছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে ‘অপারেশন নাসর-২’-এর অষ্টম ধাপের আওতায় ‘ইয়া জয়নব কুবরা (সা.)’ সংকেতনামে দুই-পর্যায়ের এক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়। এই অভিযানের সময় ‘খাইবার-শেকান’ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে জর্ডানের আল-আজরাক বিমান ঘাঁটিতে অবস্থিত যুদ্ধবিমান রক্ষণাবেক্ষণ র্যাম্প এবং যুক্তরাষ্ট্রের একটি নতুন কমান্ড ও কন্ট্রোল সেন্টারকে লক্ষ্যবস্তু করে ধ্বংস করা হয়।
‘খাইবার-শেকান’ (Kheibar-Shekan) ক্ষেপণাস্ত্রটি কতটা বিধ্বংসী?
ঐতিহাসিক ‘খাইবার যুদ্ধ’-এর নামানুসারে এই ক্ষেপণাস্ত্রটির নামকরণ করা হয়েছে; আরবিতে এর অর্থ হলো ‘যা খাইবার দুর্গ চূর্ণ-বিচূর্ণ করে’। খাইবার-শেকানকে ইরানের সবচেয়ে অত্যাধুনিক তৃতীয় প্রজন্মের মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আসুন, এর সক্ষমতাগুলোও একবার দেখে নেওয়া যাক।
সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যভেদের সক্ষমতা: এই ক্ষেপণাস্ত্রটির পাল্লা প্রায় ১,৪৫০ কিলোমিটার (৯০০ মাইল)। এর আওতার মধ্যে ইজরায়েলের সমগ্র ভূখণ্ড এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সমস্ত সামরিক ঘাঁটি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
সলিড-ফুয়েল প্রযুক্তি: ‘খাইবার-শেকান’ ক্ষেপণাস্ত্রটিতে সলিড-ফুয়েল বা কঠিন জ্বালানি ব্যবহার করা হয়। এর ফলে ক্ষেপণাস্ত্রটিকে ১৫ মিনিটেরও কম সময়ের মধ্যে উৎক্ষেপণের জন্য প্রস্তুত করা সম্ভব হয় এবং এটিকে সহজে লুকিয়ে রাখা ও পরিবহন করা যায়।
অবিশ্বাস্য ‘ম্যাক ১২’ গতি: উড্ডয়নকালে এর গতি শব্দের গতির ১২ গুণ পর্যন্ত (ঘণ্টায় প্রায় ১৯,৫০০ কিলোমিটার) পৌঁছাতে পারে। এই সুপারসনিক বা হাইপারসনিক গতির কারণে শত্রুপক্ষের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পক্ষে এটিকে মাঝপথে প্রতিহত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
উড্ডয়নকালে গতিপথ পরিবর্তনের সক্ষমতা: ‘খাইবার-শেকান’-এর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো লক্ষ্যবস্তুর দিকে যাওয়ার চূড়ান্ত পর্যায়েও এর দিক পরিবর্তনের বা কৌশলী চালনা (maneuvering) করার ক্ষমতা। এই সক্ষমতার ফলে এটি সহজেই যুক্তরাষ্ট্রের ‘প্যাট্রিয়ট’ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিতে সক্ষম হয়।
হালকা ও বিধ্বংসী: কম্পোজিট উপাদান দিয়ে তৈরি এই ক্ষেপণাস্ত্রটির ওজন মাত্র ৪.৫ টন—যা অন্যান্য ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। এটি ৫৫০ কেজি ওজনের এক বিধ্বংসী ওয়ারহেড বহন করতে সক্ষম।
‘খাইবার-শেকান’ (Kheibar-Shekan) ক্ষেপণাস্ত্রটি যেকোনো সাধারণ ১০-চাকার বাণিজ্যিক-ধাঁচের ট্রাক-ভিত্তিক লঞ্চার থেকে উৎক্ষেপণ করা সম্ভব। ফলে, যুদ্ধক্ষেত্রে এদের অবস্থান শনাক্ত করা ও ধ্বংস করা যুক্তরাষ্ট্র এবং ইজরায়েলের মতো আধুনিক রাষ্ট্রগুলোর জন্যও এক বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।





