ফয়সালাবাদ: পাকিস্তানের টেক্সটাইল শিল্পের হৃদয়স্থল ফয়সালাবাদ (Faisalabad)এখন গভীর সংকটে । শহরের প্রায় ১৫০টিরও বেশি শিল্প ইউনিট বন্ধ হয়ে গেছে, যার অধিকাংশই টেক্সটাইল মিল। এর ফলে প্রায় দেড় লক্ষ শ্রমিক রাতারাতি বেকার হয়ে পড়েছেন। ফয়সালাবাদ, যাকে পাকিস্তানের ‘ম্যানচেস্টার’ বলা হয়, সেখানকার কারখানার চাকা একসময় দিনরাত ঘুরতো। আজ সেই চাকাগুলো থেমে গেছে।
পাওয়ার লুমের শব্দ নেই, ধুলোয় ঢাকা যন্ত্রপাতি পড়ে আছে, আর শ্রমিকরা দরজায় তালা ঝুলিয়ে বসে আছেন কবে আবার কাজ শুরু হবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।ফয়সালাবাদ চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফসিসিআই) প্রতিনিধিরা সম্প্রতি বোর্ড অফ ইনভেস্টমেন্টের ফেডারেল মন্ত্রী কায়সার আহমেদ শেখের সঙ্গে বৈঠকে এই ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছেন।
আরও দেখুন: সংসদ ভবনে ওড়ানো হুমকি, ‘খলিস্তানি’ বার্তায় আতঙ্ক রাজধানী জুড়ে
তারা বলেছেন, নিরাপত্তার অভাব, নীতিগত অস্থিরতা, উচ্চ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খরচ, বাড়তে থাকা মার্কআপ রেট এবং রফতানি আদেশ কমে যাওয়া এসব মিলে শিল্পগুলো টিকে থাকতে পারছে না। অনেক শিল্পপতি তাদের ইউনিট বিদেশে সরিয়ে নিয়ে গেছেন। কেউ চীন, কেউ বাংলাদেশ বা ভিয়েতনামে চলে গেছেন, যেখানে খরচ কম এবং নীতি স্থিতিশীল। ফলে দেশের সবচেয়ে বড় রফতানি খাত টেক্সটাইল এখন ধুঁকছে।
এই সংকটের জন্য অনেকে সরাসরি আর্মি চিফ জেনারেল আসিম মুনিরের নীতি ও প্রভাবকে দায়ী করছেন। বলা হচ্ছে, তার নেতৃত্বে দেশের অর্থনৈতিক নীতি এমন দিকে গেছে যে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা পাকিস্তান ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। নিরাপত্তার অনিশ্চয়তা, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তে সেনাবাহিনীর অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ এসব কারণে বিদেশি কোম্পানিগুলো আর ঝুঁকি নিতে চাইছে না। দেশীয় বিনিয়োগকারীরাও প্রতিবাদস্বরূপ তাদের কারখানা, দোকান এবং মিল বন্ধ করে দিয়েছেন।
তারা বলছেন, উচ্চ কর, বিদ্যুতের দাম আকাশছোঁয়া (কিলোওয়াট প্রতি ৩৮-৪০ রুপি), এবং সরকারি প্রতিশ্রুতির অভাবে ব্যবসা চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে।আরও একটা বড় ধাক্কা এসেছে ভারতের সঙ্গে শুল্ক কমানোর সিদ্ধান্ত থেকে। সম্প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং আমেরিকা ভারতীয় পণ্যের ওপর শুল্ক অনেক কমিয়েছে কোথাও শূন্য, কোথাও ১৮-২৫ শতাংশে নেমেছে।
ফলে পাকিস্তানি টেক্সটাইল পণ্যের দাম তুলনামূলকভাবে বেশি পড়ছে। পাকিস্তানের টেক্সটাইল রফতানি ইউরোপ ও আমেরিকায় এতদিন GSP+ সুবিধার জোরে কিছুটা প্রতিযোগিতামূলক ছিল, কিন্তু ভারতের সঙ্গে এই শুল্ক সমতা হয়ে যাওয়ায় পাকিস্তানের বাজার হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।এই পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের দুর্দশা চোখে পড়ার মতো। অনেক পরিবারে একমাত্র উপার্জনকারী বেকার হয়ে গেছেন। বাড়িতে খাবারের জোগাড় কঠিন হয়ে পড়েছে। শিশুরা স্কুল ছেড়ে দিচ্ছে, চিকিৎসা বন্ধ।
ফয়সালাবাদের রাস্তায় এখন বেকার শ্রমিকদের ভিড় বাড়ছে, যারা দিন আনে দিন খায়। অনেকে বলছেন, এভাবে চলতে থাকলে সামাজিক অস্থিরতা বাড়বে, অপরাধ বাড়বে।সরকার অবশ্য বলছে, তারা সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছে। বিশেষ অর্থনৈতিক জোন (SEZ) গড়ে তোলা হচ্ছে, লজিস্টিকস উন্নত করা হবে। কিন্তু শিল্পপতি ও শ্রমিকরা এখন আর কথায় ভরসা করতে চান না। তারা চান তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ বিদ্যুৎ দাম কমানো, কর ছাড়, রফতানি প্রণোদনা ফিরিয়ে আনা। না হলে ফয়সালাবাদের টেক্সটাইল শিল্পের এই সংকট পুরো দেশের অর্থনীতিকে টেনে নামাবে।




















