হুগলির ঐতিহ্য (Hooghly) এবার আরও এক নতুন মাইলফলক ছুঁয়েছে। চন্দননগরের বিখ্যাত জলভরা সন্দেশ (Jalbhara Sandesh), জনাইয়ের ঐতিহ্যবাহী মনোহরা (Monohara) এবং বলাগড়ের শতাব্দী প্রাচীন ডিঙি নৌকা শিল্প সম্প্রতি জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন (GI Tag) স্বীকৃতি অর্জন করেছে। এই স্বীকৃতির ফলে শুধু রাজ্য নয়, দেশের সাংস্কৃতিক ও ঐতিহ্যবাহী মানচিত্রে আরও উজ্জ্বলভাবে উঠে এল হুগলির নাম।
মিষ্টিপ্রিয় বাঙালির কাছে চন্দননগরের জলভরা সন্দেশ এক বিশেষ আবেগের নাম। সূক্ষ্ম স্বাদের দুধ, ছানা ও ভেতরে তরল মিষ্টি পুর এই অনন্য সংমিশ্রণ জলভরা সন্দেশকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ‘সূর্য মোদকের জলভরা’ নামে পরিচিত এই মিষ্টি এখন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘চন্দননগরের জলভরা’ নামেই জি আই স্বীকৃতি পেল। এই স্বীকৃতি পাওয়ায় খুশির আবহ চন্দননগরের মিষ্টি ব্যবসায়ী মহলে।
চন্দননগরের (Hooghly) বিশিষ্ট মিষ্টি ব্যবসায়ী শৈবাল মোদক জানান, ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জলভরার জিআই স্বীকৃতির জন্য আবেদন করা হয়েছিল। দীর্ঘ প্রায় চার বছরের আইনি, প্রশাসনিক এবং প্রযুক্তিগত যাচাই প্রক্রিয়ার পর অবশেষে এই স্বীকৃতি এসেছে। তাঁর কথায়, “চন্দননগরের জলভরা বহুদিন ধরেই সর্বভারতীয় স্তরে জনপ্রিয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তুলতে জিআই স্বীকৃতি অত্যন্ত জরুরি ছিল। এই স্বীকৃতি আমাদের জন্য বড় গর্বের বিষয়।”
তিনি আরও জানান, এই মিষ্টির স্রষ্টা সূর্য মোদকের স্মৃতিকে চিরস্মরণীয় করে রাখতে একটি মূর্তি স্থাপনের জন্য স্থানীয় বিধায়কের কাছে আবেদন জানানো হয়েছে। পাশাপাশি সরকারের সহযোগিতায় গবেষণা ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের দাবি জানানো হয়েছে, যাতে জলভরার সংরক্ষণকাল বা শেল্ফ লাইফ বাড়ানো যায়। তাঁর মতে, বিদেশের বাজারে এই মিষ্টিকে আরও জনপ্রিয় করতে হলে দীর্ঘমেয়াদী সংরক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শেল্ফ লাইফ বাড়ানো সম্ভব হলে চন্দননগরের জলভরা আন্তর্জাতিক বাজারে বড় জায়গা করে নিতে পারবে বলে তিনি আশাবাদী।
অন্যদিকে, একই সঙ্গে জিআই স্বীকৃতি অর্জন করেছে হুগলির জনাইয়ের ঐতিহ্যবাহী মনোহরা মিষ্টি। বহু প্রাচীন এই মিষ্টি তার বিশেষ স্বাদ, প্রস্তুত প্রণালী এবং ঐতিহ্যবাহী রেসিপির জন্য দীর্ঘদিন ধরেই পরিচিত। বাংলার খাদ্য সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে মনোহরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষের মন জয় করে এসেছে। এই জিআই স্বীকৃতির ফলে জনাইয়ের মনোহরা শুধু রাজ্যেই নয়, দেশের বাইরেও আরও বেশি পরিচিতি পাবে বলে মনে করছেন স্থানীয় মিষ্টি প্রস্তুতকারীরা।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, এই স্বীকৃতি শুধু ঐতিহ্যকে সম্মান জানানো নয়, বরং অর্থনৈতিক দিক থেকেও একটি বড় সুযোগ। জিআই ট্যাগ পাওয়ার ফলে এই মিষ্টিগুলোর ব্র্যান্ড ভ্যালু বাড়বে এবং নতুন বাজারের দরজা খুলে যাবে।
শুধু মিষ্টিই নয়, হুগলির বলাগড়ের শতাব্দী প্রাচীন ডিঙি নৌকা শিল্পও এবার জিআই স্বীকৃতি পেয়েছে। গঙ্গার তীরে গড়ে ওঠা এই ঐতিহ্যবাহী নৌকা নির্মাণ শিল্প বাংলার জলপথ সংস্কৃতির এক অনন্য নিদর্শন। কাঠ দিয়ে তৈরি হালকা ও দ্রুতগামী এই নৌকাগুলি একসময় নদীপথে যাতায়াতের অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল। আজও এই শিল্প জীবিত রয়েছে স্থানীয় কারিগরদের হাত ধরে।



