আন্তর্জাতিক মঞ্চে আরও একবার উজ্জ্বল হতে চলেছে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম। এবার তাঁকে সাম্মানিক ডক্টর অফ লেটার্স (ডি লিট) উপাধিতে ভূষিত করতে চলেছে জাপানের ইয়োকোহামা ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি।
ধনধান্য অডিটোরিয়ামে সম্মান প্রদান
আগামী ১২ নভেম্বর কলকাতার ধনধান্য অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে এই আন্তর্জাতিক সম্মান প্রদান করা হবে মুখ্যমন্ত্রীকে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন জাপানের ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি দল ও রাজ্য সরকারের শীর্ষ প্রশাসনিক কর্তারা।
এই নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে উঠতে চলেছে তৃতীয় সাম্মানিক ডি লিট, এবং এটাই তাঁর প্রথম আন্তর্জাতিক ডক্টরেট সম্মান।
এর আগে ২০১৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ২০২৩ সালে সেন্ট জেভিয়ার্স বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ডি লিট সম্মানে ভূষিত করেছিল। এবার বাংলার গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বীকৃতি— যা নিঃসন্দেহে এক বিশেষ অর্জন বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী থেকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে Mamata Banerjee D.Litt Japan
২০১৮ সালে যখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরফে মুখ্যমন্ত্রীকে ডি লিট সম্মান দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তখন তা নিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে প্রবল বিতর্কের ঝড় উঠেছিল। রাজ্যপাল কেশরীনাথ ত্রিপাঠীর হাতে সেই সম্মান গ্রহণ করেছিলেন মমতা। বিরোধীদের অভিযোগে সে সময় বিষয়টি গিয়ে পৌঁছেছিল কলকাতা হাইকোর্ট পর্যন্ত।
তবে পরবর্তীতে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই বিতর্ক স্তিমিত হয়, এবং মুখ্যমন্ত্রীর একাডেমিক ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের আন্তর্জাতিক প্রভাবই এবার তাঁকে পৌঁছে দিল জাপানি বিশ্ববিদ্যালয়ের নজরে।
এরপর ২০২৩ সালে সেন্ট জেভিয়ার্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও মুখ্যমন্ত্রীকে সাম্মানিক ডি লিট প্রদান করা হয়। রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোসের হাত থেকে সেই সম্মান গ্রহণ করেন মমতা। এবার ইয়োকোহামা ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, যার দীর্ঘ ১৫০ বছরের একাডেমিক ঐতিহ্য, সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের তরফে মমতাকে ডি লিট প্রদানের খবর নিঃসন্দেহে রাজ্যের রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক পরিসরে এক গর্বের মুহূর্ত।
‘আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি’ হিসেবে দেখছে তৃণমূল
তৃণমূল শিবিরের মতে, এই সম্মান বাংলার উন্নয়ন মডেল ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। দলের এক প্রবীণ নেতা বলেন, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উন্নয়ন ভাবনা, সমাজকল্যাণ প্রকল্প ও মানবিক নেতৃত্ব আজ আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও প্রশংসিত। জাপানের মতো প্রযুক্তি ও প্রশাসনিক মানদণ্ডে অগ্রগামী দেশের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে এই সম্মান, বাংলার জন্যও এক গর্বের বিষয়।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও মনে করছেন, এই সম্মান কেবল ব্যক্তিগত নয়, বরং তা রাজ্যের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও প্রশাসনিক সাফল্যের আন্তর্জাতিক প্রতিচ্ছবি।
অক্সফোর্ড থেকে ইয়োকোহামা, এক ধারাবাহিক যাত্রা
শুধু প্রশাসনিক কাজ নয়, একাডেমিক পরিসরেও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সক্রিয় উপস্থিতি নজর কেড়েছে আন্তর্জাতিক মহলের।
গত মার্চ মাসে, মুখ্যমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল ব্রিটেনের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কেলগ কলেজে, যেখানে তিনি পশ্চিমবঙ্গের উন্নয়ন মডেল, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, এবং সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্নে বক্তব্য রাখেন। যদিও অনুষ্ঠানের সময় কিছু প্রতিবাদের মুখে পড়তে হয়েছিল তাঁকে, তবুও তাঁর বক্তব্য আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আলোচনায় আসে।
এবার জাপানের ইয়োকোহামা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মান সেই ধারাবাহিকতারই আরেক উজ্জ্বল অধ্যায়।
ডি লিট ও সম্মাননার ইতিহাসে মমতার অবস্থান
এর আগে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পেয়েছেন আরও বেশ কিছু উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সম্মান।
ভুবনেশ্বরের কলিঙ্গ ইনস্টিটিউট অফ ইন্ডাস্ট্রিয়াল টেকনোলজি (KIIT) তাঁকে সম্মানজনক ডক্টরেট উপাধিতে ভূষিত করেছিল। এইসব সম্মাননাই প্রতিফলিত করে তাঁর দীর্ঘ প্রশাসনিক যাত্রা, উন্নয়নমূলক নীতির দৃষ্টান্ত এবং সমাজকল্যাণকেন্দ্রিক শাসনভাবনা।
রাজনৈতিক মহল মনে করছে, একদিকে যেখানে তিনি বাংলার আঞ্চলিক রাজনীতির মুখ, অন্যদিকে তাঁর ভাবনাচিন্তা এখন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মূল্যায়িত হচ্ছে, যা কোনও মুখ্যমন্ত্রীর জন্য বিরল অর্জন।
১২ নভেম্বরের অনুষ্ঠানে জাপানি প্রতিনিধি দল
রাজ্য সরকারের সূত্রে খবর, আগামী ১২ নভেম্বর ধনধান্যে অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে রাজ্য প্রশাসনের উদ্যোগে। ইয়োকোহামা ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির প্রেসিডেন্ট-সহ একাধিক অধ্যাপক ও গবেষক প্রতিনিধি হিসেবে কলকাতায় পৌঁছবেন। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সেদিন আনুষ্ঠানিকভাবে ডি লিট ডিগ্রি প্রদান করা হবে।
উল্লেখ্য, ইয়োকোহামা বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, অর্থনীতি, এবং নীতি-প্রশাসনের ক্ষেত্রে গবেষণার জন্য বিশ্বজোড়া খ্যাত। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ও সামাজিক ন্যায়ভিত্তিক কর্মসূচি সেই ক্ষেত্রেই বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে একটি “গবেষণাযোগ্য মডেল” হিসেবে প্রতিভাত হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।
বাংলা থেকে জাপান, সংযোগের নতুন সেতু
এই সম্মান শুধু ব্যক্তিগত নয়, বরং সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধনেরও প্রতীক বলে মনে করছে কূটনৈতিক মহল।
জাপান এবং পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও প্রযুক্তিগত সংযোগ গত কয়েক বছরে বৃদ্ধি পেয়েছে। জাপানের সঙ্গে রাজ্যের বিভিন্ন অবকাঠামোগত প্রকল্পে সহযোগিতার ইতিহাসও উল্লেখযোগ্য— যেমন কলকাতা ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রো প্রকল্পে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (JICA) ভূমিকা।
ফলে এই একাডেমিক স্বীকৃতি দুই দেশের সম্পর্ককেও আরও সুদৃঢ় করতে পারে, বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
‘আন্তর্জাতিক বাংলা’র প্রতীক হয়ে উঠছেন মমতা
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এই সম্মান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কেবল রাজ্য বা জাতীয় স্তরে নয়, একজন ‘গ্লোবাল পলিটিকাল লিডার’ হিসেবে পরিচিতি দেবে। সামাজিক ন্যায়, নারীর ক্ষমতায়ন, এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রশাসনের নীতিই তাঁকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
১২ নভেম্বরের ধনধান্যে অনুষ্ঠানের পর, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একাডেমিক সম্মানের তালিকায় যুক্ত হবে আরেকটি উজ্জ্বল নাম, জাপানের ইয়োকোহামা ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এই স্বীকৃতি তাঁর প্রশাসনিক নেতৃত্বের আন্তর্জাতিক প্রতিফলন, আর বাংলার পক্ষে এটি নিঃসন্দেহে এক গর্বের অধ্যায়।
