
ইডি অভিযান ঘিরে তীব্র রাজনৈতিক তরজা, রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে উত্তাপ। কয়লাপাচার কাণ্ডের তদন্ত ঘিরে বৃহস্পতিবার ফের তীব্র উত্তেজনার সাক্ষী থাকল পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি) রাজ্যের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অভিযান চালালে পরিস্থিতি দ্রুত রাজনৈতিক রঙ নেয়। ইডির অভিযান হয় রাজনৈতিক কৌশলবিদ সংস্থা আইপ্যাকের অফিসে এবং সংস্থার সঙ্গে যুক্ত প্রতীক জৈনের বাড়িতে। এই অভিযান ঘিরেই রাজ্য রাজনীতিতে দিনভর শোরগোল, প্রতিবাদ, পাল্টা অভিযোগ ও তীব্র বাকযুদ্ধ শুরু হয়।
Read More: ইডি অভিযানে আই প্যাক পুড়লেও ক্রীড়া মন্ত্রীর উচ্চারণে সরব মমতা
ইডি সূত্রে জানা গিয়েছে, কয়লাপাচার সংক্রান্ত আর্থিক লেনদেনের তদন্তের সূত্র ধরেই এই অভিযান চালানো হয়। প্রতীক জৈনের বাড়িতে তল্লাশির সময় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি উদ্ধার করার দাবি করে ইডি। একইসঙ্গে আইপ্যাকের অফিস থেকেও একাধিক ফাইল ও ডিজিটাল নথি বাজেয়াপ্ত করা হয় বলে সংস্থার তরফে জানানো হয়েছে। তবে এই অভিযান ঘিরেই বিতর্কের সূত্রপাত।
অভিযানের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি সরাসরি ইডির বিরুদ্ধে তদন্তে বাধা দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে উল্টে দাবি করেন, ইডি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কাজ করছে। অভিযোগ ওঠে, মুখ্যমন্ত্রী নিজে প্রতীক জৈনের বাড়ি থেকে গুরুত্বপূর্ণ ফাইল ছিনিয়ে নিয়ে নিজের গাড়িতে তুলে নেন। একইভাবে আইপ্যাকের অফিস থেকেও কিছু নথি সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ সামনে আসে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই রাজ্য রাজনীতিতে ঝড় ওঠে।
Read More: ইডি বিরোধিতায় মমতার অবস্থান, ছাব্বিশে তৃণমূল ভরাডুবির ইঙ্গিত?
তৃণমূল কংগ্রেসের তরফে ইডির অভিযানকে “রাজনৈতিক প্রতিহিংসা” বলে দাবি করা হয়। দলের নেতাদের বক্তব্য, আসন্ন রাজনৈতিক সমীকরণ ও নির্বাচনের আগে বিরোধী দলগুলিকে ভয় দেখাতেই কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলিকে ব্যবহার করা হচ্ছে। অন্যদিকে বিজেপি ও বাম শিবির এই ঘটনাকে আইনের শাসনের ওপর সরাসরি আঘাত বলে বর্ণনা করেছে।
এই আবহেই বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ফেসবুকে একটি বিস্ফোরক পোস্ট করেন সিপিএম সাংসদ ও প্রখ্যাত আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য। তাঁর পোস্টে তিনি লেখেন, “আইনজীবী হিসেবে খুবই লজ্জিত ও অসম্মানিত বোধ করছি যখন দেখি, মমতার এই নির্লজ্জ আইনভঙ্গের সমর্থনে কিছু আইনজীবী মিছিল করছে।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, সাক্ষ্যপ্রমাণ লোপাট, তদন্তে বাধাদান এবং সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার মতো গুরুতর অপরাধমূলক কাজের সমর্থনে আইনজীবীদের মিছিল দেখে এক পুলিশ অফিসার প্রশ্ন তুলেছেন—“এরপরেও এদের ‘লার্নেড’ বলা যাবে?”
Read More: তদন্তকে রাজনৈতিক রং দেওয়ার চেষ্টা? মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্যে পাল্টা বিজেপি
বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যের এই মন্তব্য রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দেয়। তাঁর দাবি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলে সমাজ যে কতটা অধঃপতিত হয়েছে, এই আইনভঙ্গের পক্ষে দাঁড়ানো একাংশ আইনজীবীর মিছিলই তার প্রমাণ। একজন আইনজীবীর মূল দায়িত্ব সংবিধান ও আইনের পক্ষে দাঁড়ানো, কিন্তু সেই নীতিকে জলাঞ্জলি দিয়ে রাজনৈতিক আনুগত্য দেখানো অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বাম শিবিরের মতে, এই ঘটনায় স্পষ্ট হয়েছে যে শাসকদল প্রশাসন ও আইনের ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করছে। তদন্তকারী সংস্থার কাজে প্রকাশ্যে বাধা দেওয়া সাংবিধানিক ব্যবস্থার জন্য বিপজ্জনক নজির তৈরি করছে। বিজেপিও একই সুরে তৃণমূল কংগ্রেসকে আক্রমণ করে বলেছে, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী নিজেই যদি তদন্তে হস্তক্ষেপ করেন, তাহলে সাধারণ মানুষের কাছে আইনের শাসনের বিশ্বাস কীভাবে থাকবে?
অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেসের নেতারা বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যের মন্তব্যকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁদের দাবি, কেন্দ্রীয় সংস্থার অপব্যবহার ঢাকতেই বিরোধীরা এ ধরনের মন্তব্য করছেন।
সব মিলিয়ে কয়লাপাচার কাণ্ডের তদন্তকে কেন্দ্র করে ইডি অভিযান, মুখ্যমন্ত্রীর ভূমিকা এবং আইনজীবীদের মিছিল—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে রাজ্য রাজনীতিকে নতুন করে উত্তপ্ত করে তুলেছে। বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যের কড়া ভাষার প্রতিক্রিয়া এই বিতর্কে আইনি ও নৈতিক প্রশ্নকে আরও সামনে এনে দিয়েছে, যা আগামী দিনে রাজ্য রাজনীতিতে আরও বড় সংঘাতের ইঙ্গিত দিচ্ছে।










