
কলকাতা: রাজ্যের রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশকে কেন্দ্র করে। নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গিয়েছে, চলতি বছরের খসড়া ভোটার তালিকা থেকে পশ্চিমবঙ্গজুড়ে প্রায় ৫৮ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়েছে। এই বিপুল সংখ্যক নাম বাদ যাওয়ায় শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস প্রকাশ্যে উদ্বেগ জানিয়েছে। দলের দাবি, প্রশাসনিক সংশোধনের নামে বহু ক্ষেত্রেই বৈধ ভোটারের ভোটাধিকার খর্ব হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে নির্বাচন কমিশনের আনুষ্ঠানিক শুনানি শুরু হওয়ার আগেই সাংগঠনিক প্রস্তুতি জোরদার করতে তৎপর তৃণমূল কংগ্রেস। আগামী ২২ ডিসেম্বর, সোমবার, কলকাতার নেতাজি ইনডোর স্টেডিয়ামে দলের বুথ লেভেল এজেন্ট বা বিএলএ (BLA)-দের নিয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসতে চলেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজনৈতিক মহলের মতে, এই বৈঠকের সময়কাল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, ২৩ ডিসেম্বর থেকে ভোটার তালিকা সংশোধন সংক্রান্ত শুনানি শুরু হবে। তার ঠিক একদিন আগে এই বৈঠক করে দলীয় কর্মীদের স্পষ্ট নির্দেশ দিতে চাইছে তৃণমূল নেতৃত্ব। কমিশনের তরফে ইতিমধ্যেই জানানো হয়েছে, প্রয়োজনে খসড়া তালিকায় নাম থাকা ভোটারদেরও শুনানিতে ডাকা হতে পারে। ফলে সাধারণ মানুষের হয়রানি এবং বৈধ ভোটারের নাম বাদ পড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
দলীয় সূত্রে খবর, সোমবারের বৈঠকে মূলত কলকাতা, হাওড়া এবং হুগলি জেলার একাংশের বিএলএ-দের উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে। উল্লেখযোগ্যভাবে, খসড়া তালিকা প্রকাশের দিনই মুখ্যমন্ত্রী নিজের বিধানসভা কেন্দ্র ভবানীপুরে বিএলএ-দের নিয়ে বৈঠক করেন। সেই বৈঠকেই তিনি স্পষ্ট করে দেন, এসআইআর (Special Intensive Revision) প্রক্রিয়া নিয়ে দল কোনওরকম শিথিলতা বরদাস্ত করবে না।
২২ ডিসেম্বরের বৈঠক থেকে মমতা ও অভিষেক বিএলএ-দের নির্দেশ দিতে পারেন, যাতে তারা বুথ লেভেল অফিসার (BLO)-দের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় রেখে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য যাচাই করেন। মৃত, স্থানান্তরিত বা দ্বৈত ভোটারের নাম বাদ যাওয়া প্রশাসনিকভাবে স্বাভাবিক হলেও, সেই প্রক্রিয়ার আড়ালে কোনও বৈধ নাগরিকের ভোটাধিকার যাতে ক্ষুণ্ণ না হয়, তা নিশ্চিত করতে বলা হতে পারে।
এই সাংগঠনিক তৎপরতার মাঝেই রাজ্য রাজনীতিতে মানবিক ও নাগরিকত্ব সংক্রান্ত আরেকটি ইস্যু নতুন করে সামনে এসেছে। বীরভূমের সুনালি খাতুন যিনি বিএসএফ-এর হাতে ‘পুশব্যাক’ হয়ে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছিলেন সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপে সম্প্রতি দেশে ফেরেন। দলীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারেন বলে আলোচনা চলছিল।
অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় সুনালিকে বাংলাদেশে পাঠানোর ঘটনায় সুপ্রিম কোর্ট কেন্দ্রীয় সরকারকে ভর্ৎসনা করে এবং মানবিকতার প্রশ্নে কড়া পর্যবেক্ষণ দেয়। আদালত প্রশ্ন তোলে, সুনালির বাবা যদি ভারতীয় নাগরিক হন, তবে তাঁকে কীভাবে বাংলাদেশি বলা যায়? এই রায়কে তৃণমূল কংগ্রেস নৈতিক জয় হিসেবেই দেখছে।
বর্তমানে শারীরিক অসুস্থতার কারণে সুনালি খাতুন রামপুরহাট মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে, তিনি এখন ‘স্পেশাল অবজারভেশন’-এ রয়েছেন এবং চিকিৎসকদের পরামর্শে পরিবারের সদস্য ছাড়া অন্য কারও সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ সীমিত রাখা হয়েছে।
একদিকে ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে কমিশনের শুনানির আগে সংগঠনকে সতর্ক করা, অন্যদিকে মানবাধিকার ও নাগরিকত্ব প্রশ্নে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বার্তা—সব মিলিয়ে বছর শেষের আগেই আগ্রাসী কৌশল নিচ্ছে তৃণমূল কংগ্রেস। এখন রাজনৈতিক মহলের নজর ২২ ডিসেম্বর নেতাজি ইনডোরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্যের দিকেই।










