
ভোটের মুখে পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা ঘিরে বড়সড় প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ঝাঁকুনি। নির্বাচন কমিশন (ECI) প্রকাশিত খসড়া ভোটার তালিকা অনুযায়ী, রাজ্যে ৫৮ লক্ষেরও বেশি ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে। বিতর্কিত বিশেষ নিবিড় সংশোধন (Special Intensive Revision বা SIR) প্রক্রিয়ার পর এই খসড়া তালিকা প্রকাশের মধ্য দিয়েই শেষ হল গণনা পর্ব। একই সঙ্গে শুরু হয়ে গেল আরও স্পর্শকাতর ধাপ— দাবি, আপত্তি ও শুনানি।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, তিন ধাপে হওয়া SIR প্রক্রিয়ার দ্বিতীয় পর্যায় চলবে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। সব ধাপ শেষে ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ প্রকাশিত হবে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা— তার ঠিক আগেই অনুষ্ঠিত হতে চলা রাজ্যের উচ্চ-ঝুঁকির বিধানসভা নির্বাচনের নিরিখে যা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
৫৮ লক্ষের বেশি নাম বাদ দেওয়ার প্রস্তাব
কমিশনের প্রকাশিত পরিসংখ্যান বলছে, খসড়া তালিকায় মোট ৫৮,২০,৮৯৮ জন ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার জন্য চিহ্নিত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ— ২৪,১৬,৮৫২ জন ভোটারকে মৃত হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন ১৯,৮৮,০৭৬ জন ভোটার, যাঁরা স্থায়ীভাবে অন্যত্র চলে গিয়েছেন অথবা রাজ্যের বাইরে স্থানান্তরিত হয়েছেন।
এ ছাড়াও, ১২,২০,০৩৮ জন ভোটারকে ‘নিখোঁজ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে ১,৩৮,৩২৮টি নাম ডুপ্লিকেট, ভুয়ো বা জাল এন্ট্রি হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছে। আরও ৫৭,৬০৪টি নাম বাদ দেওয়ার প্রস্তাব এসেছে ‘অন্যান্য কারণ’-এর আওতায়।
তবে কমিশনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে জানানো হয়েছে, যাঁদের নাম খসড়া তালিকায় বাদ পড়েছে বা বাদ দেওয়ার প্রস্তাব এসেছে, তাঁরা ফর্ম ৬ জমা দিয়ে নিজেদের দাবি ও আপত্তি জানাতে পারবেন। প্রয়োজনীয় নথি সহ আবেদন করলে শুনানির পর সংশ্লিষ্ট বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা হবে।
বিতর্কে জর্জরিত SIR প্রক্রিয়া ECI Draft Voter List Controversy West Bengal
পশ্চিমবঙ্গে SIR প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল ৪ ডিসেম্বর, শেষ হয় ১১ ডিসেম্বর— মাত্র সাত দিনের একটি অত্যন্ত চাপযুক্ত সময়সীমায়। এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই গোটা প্রক্রিয়াটি ঘিরে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়। প্রশাসনিক সূত্রে দাবি, অভিযানের সময়ে অবৈধ বাংলাদেশি নাগরিকদের একটি বড় অংশ রাজ্য ছেড়ে চলে যায়। অন্য দিকে, অতিরিক্ত কাজের চাপ, কড়া সময়সীমা ও মাঠপর্যায়ের বাস্তব সমস্যার অভিযোগ তুলে ব্লক লেভেল অফিসারদের (BLO) একাংশ প্রতিবাদে নামেন।
শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের অভিযোগ আরও গুরুতর। দলের দাবি, SIR প্রক্রিয়ার সময় কাজের চাপ ও মানসিক চাপে প্রায় ৪০ জন নির্বাচনকর্মীর মৃত্যু হয়েছে। যদিও এই অভিযোগ নিয়ে নির্বাচন কমিশনের তরফে এখনও পর্যন্ত কোনও আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি বা বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া মেলেনি।
মুখ্যমন্ত্রীর তীব্র আপত্তি
SIR প্রক্রিয়ার শুরু থেকেই এর তীব্র বিরোধিতা করে আসছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর অভিযোগ, বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে ভোটার তালিকা প্রভাবিত করার সুপরিকল্পিত চেষ্টা চালাচ্ছে বিজেপি ও নির্বাচন কমিশন। মুখ্যমন্ত্রী একাধিক সভা থেকে স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, “বাংলার মানুষকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হতে দেওয়া হবে না।”
এক নির্বাচনী সভায় তাঁর কড়া মন্তব্য, “যদি আপনার নাম ভোটার লিস্ট থেকে কেটে দেওয়া হয়, তা হলে কেন্দ্রীয় সরকারকেও কেটে দেওয়া উচিত।” এই মন্তব্য রাজ্যের রাজনৈতিক উত্তাপ আরও বাড়িয়েছে।
আর কোথায় এসআইআর
উল্লেখযোগ্য ভাবে, পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ, ছত্তীসগঢ়, গোয়া, গুজরাট, কেরল, লক্ষদ্বীপ, মধ্যপ্রদেশ, পুদুচেরি, রাজস্থান, তামিলনাড়ু এবং উত্তরপ্রদেশে একযোগে SIR প্রক্রিয়া চলছে। তবে ভোটের প্রাক্কালে পশ্চিমবঙ্গে এর প্রভাব ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া যে সবচেয়ে তীব্র, তা মানছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা।
খসড়া তালিকার পর এখন সব নজর দাবি-আপত্তি ও শুনানি পর্বের দিকে। এই ধাপেই ঠিক হবে— কারা ভোটার তালিকায় ফিরবেন, আর কারা স্থায়ীভাবে বাদ পড়বেন। কার্যত এই পর্বই নির্ধারণ করবে ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের আগে বাংলার ভোটার মানচিত্রের চূড়ান্ত রূপরেখা।










