কলকাতা: “Video Assistant Referee (VAR) এলে কি বদলাবে বাংলা ফুটবল?” এই প্রশ্নটা এখন ক্রমশ প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে। বিশ্ব ফুটবলে VAR ইতিমধ্যেই এক বড় পরিবর্তনের সূচনা করেছে। কিন্তু বাংলার ফুটবলে এর প্রয়োগ কতটা বাস্তবসম্মত এবং কতটা কার্যকর হতে পারে, তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। প্রথমেই বুঝতে হবে VAR আসলে কী। এটি এমন একটি প্রযুক্তি, যেখানে ম্যাচ চলাকালীন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত যেমন গোল, পেনাল্টি, লাল কার্ড বা ভুল পরিচয়, পুনর্বিবেচনা করা হয় ভিডিও ফুটেজের সাহায্যে।
ফলে মানবিক ভুল কমানো সম্ভব হয়। বাংলার ফুটবলে, বিশেষ করে কলকাতা ময়দানে, রেফারির সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক নতুন কিছু নয়। বহু গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচেই ভুল সিদ্ধান্ত ম্যাচের ফলাফল বদলে দিয়েছে। এই জায়গায় VAR নিঃসন্দেহে স্বচ্ছতা আনতে পারে।
তবে বাস্তব চিত্রটা এতটা সহজ নয়। প্রথম সমস্যা হলো অবকাঠামো। VAR চালু করতে হলে উচ্চমানের ক্যামেরা, রিপ্লে সিস্টেম, আলাদা টেকনিক্যাল টিম এবং প্রশিক্ষিত রেফারির প্রয়োজন। কলকাতার বড় ম্যাচগুলোতে এই ব্যবস্থা করা সম্ভব হলেও, পুরো বাংলা জুড়ে সব লিগে এটি প্রয়োগ করা কঠিন। বিশেষ করে Calcutta Football League-এর মতো প্রতিযোগিতায় অনেক ম্যাচ ছোট মাঠে বা সীমিত সুবিধায় অনুষ্ঠিত হয়।
দ্বিতীয়ত, খরচ একটি বড় বাধা। VAR প্রযুক্তি অত্যন্ত ব্যয়বহুল। ক্লাবগুলোর আর্থিক অবস্থা এবং আয়োজকদের বাজেটের কথা মাথায় রাখলে, এই বিনিয়োগ সবসময় সম্ভব নয়। ফলে প্রশ্ন ওঠে—বাংলা ফুটবলের বর্তমান কাঠামোয় VAR আদৌ বাস্তবায়নযোগ্য কি না।
তৃতীয় একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো খেলার গতি। অনেক সময় দেখা যায়, VAR ব্যবহারের ফলে খেলা থেমে যায় এবং দর্শকদের আগ্রহে সাময়িক ভাটা পড়ে। ময়দানের আবেগ, গ্যালারির চিৎকার—এসবই বাংলা ফুটবলের প্রাণ। VAR এলে সেই স্বতঃস্ফূর্ততা কিছুটা কমে যেতে পারে বলেও অনেকের মত। এ বিষয়ে বাংলা থেকে ফিফার একমাত্র প্রাক্তন রেফারি প্রাঞ্জল ব্যানার্জি বলেছেন ” বাংলার ফুটবলে VAR চালু হলে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হবে স্বচ্ছতার ক্ষেত্রে। বহু সময় দেখা যায়, গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে গোল বা পেনাল্টি সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়। VAR থাকলে এই ধরনের বিতর্ক অনেকটাই কমে আসবে। বিশেষ করে Mohun Bagan Super Giant বনাম East Bengal FC-এর মতো হাই-ভোল্টেজ ম্যাচে এটি অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে।তবে তিনি সতর্কও করেছেন। তাঁর কথায়, VAR ব্যবহারের জন্য যে পরিকাঠামো দরকার, তা বাংলার সব স্তরের ফুটবলে এখনও নেই। উচ্চমানের ক্যামেরা, রিপ্লে সিস্টেম এবং প্রশিক্ষিত টেকনিক্যাল টিম ছাড়া VAR কার্যকরভাবে চালানো সম্ভব নয়। Calcutta Football League-এর মতো প্রতিযোগিতায় সব ম্যাচে এই সুবিধা দেওয়া এখনই কঠিন”।
তবে ইতিবাচক দিকও কম নয়। বড় ম্যাচে, বিশেষ করে Mohun Bagan Super Giant বনাম East Bengal FC ডার্বির মতো হাই-ভোল্টেজ লড়াইয়ে VAR বড় ভূমিকা নিতে পারে। বিতর্কিত সিদ্ধান্ত কমবে, খেলোয়াড়দের মধ্যে অযথা উত্তেজনা কমবে, এবং ম্যাচ আরও ন্যায্যভাবে পরিচালিত হবে। এতে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে তাল মেলাতেও সুবিধা হবে। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রেফারিদের মানোন্নয়ন। VAR থাকলে রেফারিরা নিজের সিদ্ধান্ত যাচাই করার সুযোগ পাবেন, যা তাঁদের আত্মবিশ্বাস বাড়াবে এবং দীর্ঘমেয়াদে রেফারিংয়ের মান উন্নত করবে।
সব দিক বিচার করলে বলা যায়, VAR বাংলা ফুটবলে অবশ্যই পরিবর্তন আনতে পারে, কিন্তু তা ধীরে ধীরে এবং পরিকল্পিতভাবে করতে হবে। প্রথমে বড় টুর্নামেন্ট বা গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা যেতে পারে। পরে সফল হলে ধাপে ধাপে অন্যান্য প্রতিযোগিতায় প্রসার ঘটানো সম্ভব। অতএব, VAR কোনো ম্যাজিক সমাধান নয়, তবে সঠিকভাবে প্রয়োগ করা গেলে এটি বাংলা ফুটবলকে আরও আধুনিক, স্বচ্ছ এবং প্রতিযোগিতামূলক করে তুলতে পারে।




















