এ যেন শুধু একটা ট্রফি জয়ের উদযাপন নয়, এ ছিল দীর্ঘ বাইশ বছরের জমে থাকা আবেগের বিস্ফোরণ। যুবভারতীর চারপাশ তখন লাল-হলুদ রঙে ঢেকে গিয়েছে। গ্যালারি থেকে মাঠ, মাঠ থেকে ব্যালকনি— সর্বত্র শুধুই ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের উন্মাদনা। কেউ লোহার বেড়া টপকে মাঠে ঢুকেছেন, কেউ আবার পুলিশের বাধাকেও পাত্তা দেননি। চারদিকে শুধু একটাই সুর- “ইস্টবেঙ্গল, ইস্টবেঙ্গল।” সেই আবেগের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন অস্কার ব্রুজো।
ইউসেফ, মিগুয়েল, আনোয়ার, প্রভসুখনদের সঙ্গে কোচ ব্রুজো যখন সমর্থকদের সামনে এলেন, তখন যেন আবেগের বাঁধ ভেঙে পড়ে। কেউ তাঁর পায়ে হাত দিয়ে আশীর্বাদ নিলেন, কেউ কাঁদতে কাঁদতে অনুরোধ করলেন, “স্যার, আমাদের ছেড়ে যাবেন না।” সেই মুহূর্তে ব্রুজো আর শুধু কোচ নন, তিনি যেন লাল-হলুদ সমর্থকদের স্বপ্নের কারিগর। বহু ব্যর্থতা, হতাশা আর অপমানের পরে তিনি ফিরিয়ে দিয়েছেন বিশ্বাস।
ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে ট্রফি হাতে যখন তিনি সমর্থকদের উদ্দেশে তুলে ধরলেন, তখন নিচে হাজার হাজার মানুষের একসঙ্গে গর্জে ওঠা যেন বুঝিয়ে দিল, এই মানুষটাকে কতটা আপন করে নিয়েছে ইস্টবেঙ্গল পরিবার। আবেগঘন কণ্ঠে ব্রুজো বললেন, “আজ আমি বিশ্বের সবচেয়ে সুখী মানুষ।” তাঁর চোখেমুখে তখন ক্লান্তির চেয়ে বেশি ছিল তৃপ্তি। কারণ, এই দলটা শুধু একটা ম্যাচ জেতেনি, ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই জিতেছে।
ফাইনালে প্রথমে পিছিয়ে পড়েও যেভাবে দল লড়াই করে ফিরে এসেছে, সেটাকেই ইস্টবেঙ্গলের প্রকৃত পরিচয় বলে মনে করেন ব্রুজো। তাঁর কথায়, “ইস্টবেঙ্গল একটা ইতিহাস। এই ক্লাব হার মানতে জানে না। কঠিন সময়েও লড়াই করে ফিরে আসাই এদের ঐতিহ্য।” কথাগুলো শুনে বোঝা যাচ্ছিল, কয়েক মাসের মধ্যেই ক্লাবটার সঙ্গে কত গভীরভাবে জড়িয়ে গিয়েছেন তিনি।
অথচ কয়েক সপ্তাহ আগেও ছবিটা ছিল একেবারে আলাদা। আইএসএল চলাকালীন মুম্বই সিটি ম্যাচের আগে ব্রুজো নিজেই জানিয়েছিলেন, পরের মরশুমে তিনি হয়তো থাকবেন না। কারণ হিসেবে বলেছিলেন, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে তাঁর কাছে স্পষ্ট কোনও ধারণা নেই। তখন থেকেই ধরে নেওয়া হচ্ছিল, মরশুম শেষ হলেই হয়তো তিনি অন্য কোনও ক্লাবে চলে যাবেন। সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড কিংবা এফসি গোয়ার মতো জায়গা থেকেও তাঁর কাছে প্রস্তাব ছিল বলে খবর ছড়ায়।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতি বদলেছে। ক্লাব কর্তারা তাঁকে থেকে যাওয়ার আবেদন জানিয়েছেন। সমর্থকেরাও ভালোবাসা দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন, ব্রুজো এখন শুধুই একজন বিদেশি কোচ নন, তিনি ইস্টবেঙ্গলের পরিবারের অংশ। আর এবার তো সেই বহু প্রতীক্ষিত স্বপ্নও পূরণ হয়েছে। তাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন একটাই— লাল-হলুদের এই অগাধ ভালোবাসা কি শেষ পর্যন্ত আটকে রাখতে পারবে অস্কার ব্রুজোকে? সমর্থকেরা অন্তত বিশ্বাস করতে চাইছেন, তাঁদের ‘হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালা’ এখনও কোথাও যাচ্ছেন না।




















