বিশ্বকাপের (FIFA World Cup) শুরু থেকেই আর্জেন্টিনাকে ঘিরে নানা বিতর্ক এবং আলোচনা চলছিল। কখনও রেফারিং, কখনও সূচি, আবার কখনও বিশেষ সুবিধা পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে গতবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিরুদ্ধে। এবার সেমিফাইনালের আগে নতুন করে চর্চার কেন্দ্রবিন্দুতে লিওনেল মেসিদের জার্সি। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে নিজেদের ঐতিহ্যবাহী আকাশি-সাদা ডোরাকাটা জার্সির বদলে গাঢ় নীল অ্যাওয়ে কিট পরে মাঠে নামার অনুমতি চেয়েছিল আর্জেন্টিনা। সেই আবেদন অনুমোদন করেছে ফিফা। ফলে সেমিফাইনালে সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপে দেখা যাবে মেসি ও তাঁর সতীর্থদের।
এই সিদ্ধান্ত শুধুই পোশাক বদলের নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ইতিহাস, বিশ্বাস এবং মানসিক লড়াইয়ের কৌশল। আর্জেন্টিনার ফুটবল মহলে দীর্ঘদিন ধরে একটি ধারণা প্রচলিত রয়েছে, যাকে তারা ‘কাবালা’ বলে। এই বিশ্বাস অনুযায়ী, নির্দিষ্ট কিছু অভ্যাস বা প্রতীক সৌভাগ্য এনে দেয়। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে গাঢ় নীল জার্সি সেই সৌভাগ্যেরই প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
এই বিশ্বাসের পেছনে রয়েছে বিশ্বকাপের ইতিহাস। ১৯৮৬ সালের কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে সেমিফাইনালে উঠেছিল আর্জেন্টিনা। সেই ম্যাচেই দিয়েগো মারাদোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ এবং শতাব্দীর সেরা গোল ফুটবল ইতিহাসে অমর হয়ে রয়েছে। সেদিন মারাদোনারা খেলেছিলেন গাঢ় নীল জার্সিতে। এরপর ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপেও ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে একই রঙের জার্সি পরে জয় পেয়েছিল আর্জেন্টিনা। ফলে এই জার্সি ধীরে ধীরে দলের কাছে সৌভাগ্যের প্রতীক হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে, ২০০২ সালের বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড যখন আর্জেন্টিনাকে হারিয়েছিল, তখন আর্জেন্টিনা খেলেছিল তাদের পরিচিত নীল-সাদা হোম কিটে। সেই ফলাফলও আর্জেন্টিনার সমর্থকদের বিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করেছে। তাদের মতে, ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে বড় ম্যাচে গাঢ় নীল জার্সিই সবচেয়ে শুভ।
বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার লড়াই শুধু ফুটবলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। দুই দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস, বিশেষ করে ফকল্যান্ড যুদ্ধের স্মৃতি, এই দ্বৈরথকে বরাবরই আবেগ ও উত্তেজনার অন্য মাত্রা দিয়েছে। তাই মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি মানসিক চাপ তৈরির কৌশলও দুই দলের প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।
এবারের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা এখনও পর্যন্ত প্রতিটি ম্যাচ খেলেছে তাদের ঐতিহ্যবাহী নীল-সাদা জার্সিতে এবং প্রতিটি ম্যাচেই জয় পেয়েছে। তবু সেমিফাইনালের মতো মহারণের আগে অতীতের সফল স্মৃতিকে ফিরিয়ে আনতে গাঢ় নীল জার্সিকেই বেছে নিয়েছে দল। অনেকের মতে, এটি প্রতিপক্ষের উপর মানসিক প্রভাব ফেলতেই নেওয়া হয়েছে। ইংল্যান্ডের ফুটবলারদেরও মনে করিয়ে দেওয়া হবে অতীতের সেই তিক্ত পরাজয়গুলোর কথা।
তবে ফুটবল বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করেন, জার্সির রং নয়, ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করবে মাঠের পারফরম্যান্স। কৌশল, শৃঙ্খলা, সুযোগ কাজে লাগানোর ক্ষমতা এবং বড় মুহূর্তে স্নায়ুর নিয়ন্ত্রণই শেষ পর্যন্ত সাফল্যের চাবিকাঠি হবে। ইতিহাস অনুপ্রেরণা দিতে পারে, কিন্তু জয় নিশ্চিত করতে পারে না।
তবুও সেমিফাইনালের আগে জার্সি বদলের এই সিদ্ধান্ত ম্যাচে আলাদা মাত্রা যোগ করেছে। এখন দেখার, আর্জেন্টিনার ‘পয়া’ গাঢ় নীল জার্সি আবারও ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটায়, নাকি হ্যারি কেনদের ইংল্যান্ড অতীতের হিসাব মিটিয়ে নতুন ইতিহাস লেখে ?




