পৃথিবী থেকে ডাইনোসরদের বিলুপ্ত করে দেওয়া সেই বিরল উল্কাপিণ্ডটি খুঁজে পেলেন বিজ্ঞানীরা!

Co-chondrite Meteorite: প্রায় ৬ কোটি ৬০ লক্ষ বছর আগে পৃথিবীতে এমন এক বিপর্যয়কর ঘটনা ঘটেছিল যা ইতিহাসের গতিপথ চিরতরে বদলে দিয়েছিল। একটি বিশাল উল্কাপিন্ড আমাদের…

Dinosaur, meteorite

Co-chondrite Meteorite: প্রায় ৬ কোটি ৬০ লক্ষ বছর আগে পৃথিবীতে এমন এক বিপর্যয়কর ঘটনা ঘটেছিল যা ইতিহাসের গতিপথ চিরতরে বদলে দিয়েছিল। একটি বিশাল উল্কাপিন্ড আমাদের গ্রহে আঘাত হেনেছিল, যার ফলে পৃথিবীর ৭৫ শতাংশ প্রজাতি—যার মধ্যে একসময় পৃথিবীতে আধিপত্য বিস্তারকারী বিশাল সব ডাইনোসরও অন্তর্ভুক্ত ছিল—সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হয়ে যায়। দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানীরা জানার চেষ্টা করছিলেন যে উল্কাপিণ্ডটি কী দিয়ে গঠিত এবং মহাকাশের কোন প্রান্ত থেকে এর উৎপত্তি। অবশেষে, ইউনিভার্সিটি অফ ব্রিটিশ কলম্বিয়া (UBC) এবং প্যারিস, ব্রাসেলস ও ভিয়েনার বিজ্ঞানীদের সমন্বয়ে গঠিত একটি আন্তর্জাতিক দল এই রহস্য উন্মোচন করেছে।

সৌরজগতের একটি অত্যন্ত বিরল ‘সিও কনড্রাইট’ (CO chondrite) উল্কাপিণ্ড
বিজ্ঞানীরা মাটির একটি পাতলা স্তরে বিদ্যমান নিকেল আইসোটোপ নিয়ে গবেষণার মাধ্যমে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন—যে স্তরটি ক্রিটেশিয়াস-প্যালিওজিন (K-Pg) যুগের সেই মহাজাগতিক আঘাতের ঘটনার সাক্ষ্য বহন করছে। গবেষণায় দেখা গেছে যে, পৃথিবীতে আঘাত হানা উল্কাপিণ্ডটি কোনো সাধারণ পাথর ছিল না; বরং এটি ছিল ‘সিও কনড্রাইট’ (CO Chondrite) নামে পরিচিত অত্যন্ত বিরল এক ধরনের কার্বনেসিয়াস গ্রহাণু। পৃথিবীতে প্রাপ্ত মোট উল্কাপিণ্ডের মধ্যে এ ধরনের উল্কার হার মাত্র ৫ শতাংশ। সৌরজগতের অন্যতম প্রাচীন ও আদিম বা অপরিবর্তিত অবস্থার পাথর হিসেবে এটিকে বিবেচনা করা হয়।

Advertisements

বৃহস্পতির নিকটবর্তী অঞ্চল থেকে ধেয়ে এসেছিল এক মহাবিপর্যয়
গবেষকদের মতে, প্রায় ১০ কিলোমিটার চওড়া বিশাল এই গ্রহাণুটির উৎপত্তি হয়েছিল আমাদের সৌরজগতের দূরবর্তী কোনো প্রান্তে। সম্ভবত কক্ষপথ থেকে বিচ্যুত হয়ে—হয়তো বৃহস্পতির কাছাকাছি অবস্থিত বাইরের গ্রহাণু বলয় কিংবা ধ্বংসাবশেষে পূর্ণ কোনো দূরবর্তী অঞ্চল থেকে—এটি সরাসরি পৃথিবীর দিকে ধেয়ে এসেছিল। মেক্সিকোর ইউকাটান উপদ্বীপে আঘাত হানার ফলে এটি ১৮০ কিলোমিটার ব্যাসের ‘চিকসুলুব গহ্বর’ (Chicxulub Crater) সৃষ্টি করে। এই আঘাতের ফলে তীব্র ভূমিকম্প, সুনামি এবং দাবানলের সৃষ্টি হয়েছিল, যার ফলে সৃষ্ট ধোঁয়ায় পুরো পৃথিবী আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল।

সালফার নয়, বরং ধূলিকণার মেঘই ছিল প্রকৃত ঘাতক। এতদিন ধারণা করা হতো যে, উল্কাপিণ্ডে থাকা সালফার গ্যাসে রূপান্তরিত হয়ে বায়ুমণ্ডলকে বিষাক্ত করে তুলেছিল। তবে নতুন এই আবিষ্কার সেই পুরনো ধারণাকে কিছুটা বদলে দিয়েছে। ‘সিও-টাইপ কনড্রাইট’ (CO-type chondrite) গোত্রের উল্কাপিণ্ডগুলোতে কার্বন, দস্তা, জল এবং বিশেষ করে সালফারের মতো উপাদান অত্যন্ত সামান্য পরিমাণে থাকে। বিজ্ঞানীদের মতে, ডাইনোসরদের বিলুপ্তির মূল কারণ সালফার গ্যাস ছিল না; বরং উল্কাপিণ্ডের আঘাতের ফলে মহাকাশ ও বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়া কোটি কোটি টন সূক্ষ্ম ধ্বংসাবশেষ ও ধূলিকণাই ছিল এর আসল কারণ।

দীর্ঘ সময় ধরে সূর্য ঢাকা পড়ে ছিল এবং পৃথিবী শীতল হয়ে পড়েছিল। যখন এই বিরল উল্কাপিণ্ডটি আঘাত হানে, তখন তার ফলে সৃষ্ট ধুলো ও সূক্ষ্ম ধ্বংসাবশেষ পৃথিবীর সমগ্র বায়ুমণ্ডলকে এক ঘন আবরণের মতো ঢেকে ফেলে। এর ফলে বছরের পর বছর ধরে সূর্যের আলো ভূপৃষ্ঠে পৌঁছাতে পারেনি। আলোর অভাবে গাছপালা ধ্বংস হয়ে যায়, যার ফলে পুরো খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে পড়ে। পৃথিবীর তাপমাত্রা দ্রুত হ্রাস পায় এবং জলবায়ু ব্যবস্থায় এক বিপর্যয়কর ধস নামে। বিজ্ঞানীরা বলছেন যে, এই আবিষ্কার প্রমাণ করে যে পৃথিবী অত্যন্ত বিরল ও অসাধারণ এক মহাজাগতিক ঘটনার আঘাতের সম্মুখীন হয়েছিল, যা মানবজীবনের বিবর্তনের পথ প্রশস্ত করেছিল।