Kolkata Rajbhawan: লাটসাহেব মাতেন সত্যনারায়ণ পুজোয়, রাজভবনে হয় দুর্গাপুজোও

250
Kolkata Rajbhawan durga puja

বিশেষ প্রতিবেদন: চলতি বছরে রাজভবনেন পুরোহিতদের নিয়ে শুভেন্দু অধিকারীর রাজ্যপালের বৈঠক নিয়ে প্রচুর প্রশ্ন উঠেছিল। সরকারি কার্যস্থল ধর্মীয় আলোচনার স্থান হয়ে যাচ্ছে কিন্তু ক’জন জানেন রাজভবনে (Rajbhawan) এক সময় হত কীর্তন। হয়েছে সত্যানারায়ণ পুজো। এখনও প্রত্যেক বছর হয় দুর্গাপুজো।

দেশ স্বাধীন হবার সাল অর্থাৎ ১৯৪৭ সালের ১৫ আগষ্ট থেকে এখনও পর্যন্ত প্রতি বছরই মহাধুমধামের সঙ্গে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। ইউটিউবে একটু খুঁজলেই কলকাতা রাজভবনের ২০১৯ সালের দুর্গাপূজার ভিডিওটি দেখা যায়। অতীতে বেশ কয়েক বছর কলকাতা দূরদর্শন মারফৎ বেশ ফলাও করে কলকাতা রাজভবনের দুর্গাপূজা দেখানোও হয়েছিল। তবে অতীতের রাজভবনের দুর্গাপূজার সেই জৌলুস এখন আর নেই।

অতীতে কিন্তু লাটের দুর্গাপূজা কলকাতার যে কোনো নামী দূর্গাপূজার চেয়ে কম জৌলুসপূর্ণ ছিল না, এটা হয়তো অনেকেরই জানা নেই। তখন সেই দুর্গাপূজায় থাকত নানা রকমের ইলেকট্রিক লাইটের সদৃশ্য খেলা, থাকত কলকাতার সব চেয়ে বিখ্যাত ডেকরেটার দিয়ে পূজাপ্রাঙ্গণ সজ্জা, থাকত বিখ্যাত বিখ্যাত চলচ্চিত্র ছবির প্রদর্শনী, থাকত নামী রেডিও ও টিভির শিল্পীদের দিয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সুন্দর মেহফিল ইত্যাদি ইত্যাদি। ১৮০৩ সালে, ‘লর্ড ওয়েলেসলী’ যখন কলকাতার ওই অসামান্যা রূপসী রাজভবন তৈরী করিয়েছিলেন তখন হয়তো কোন ইংরেজ স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারে নি যে ওই কলকাতা রাজভবনের ‘গভর্ণর এস্টেটের’ অন্তর্গত ‘ছয় নম্বর ওয়েলেসলী প্লেসের’ বিরাট প্রাঙ্গণে কালের কুটিল গতিতে একদিন সেখানে মা দুর্গা তাঁর পুত্র ও কন্যা – কার্তিক, গণেশ, লক্ষ্মী ও সরস্বতীকে নিয়ে সদলবলে পূজা গ্রহণ করতে আসবেন, তাও আবার প্রতি বছর।

অতীতে, কলকাতার অফিস পাড়ার রাজভবন চত্বরের আশেপাশে সমগ্র ‘ডালহৌসী স্কোয়ারে’ মাত্র দুটি দুর্গাপূজা হত। সেগুলির একটা হচ্ছে খোদ রাজভবনের চত্বরে সেই ১৯৪৭ সাল থেকে। আর একটা দুর্গাপূজা হত – ‘১ নং কাউন্সিল হাউস স্ট্রীটের’ কেন্দ্রীয় অফিসের এক অবিবাহিত কেয়ারটেকার, জনৈক ‘মিঃ ব্যানার্জি’র উদ্যোগে, ঐ অফিসের একটু ছোট আঙ্গিনায় নমোঃ নমোঃ করে। দ্বিতীয়টা এখন আর হয় না। কলকাতাবাসী মাত্রেরই সকলেরই জানা আছে যে দূর্গাপূজার সময় নিদেনপক্ষে অন্ততঃ, সপ্তমী-অষ্টমী-নবমী-দশমী, এই ক’দিন, কলকাতার সদাচঞ্চল ‘অফিসপাড়া’, ওই ‘ডালহৌসী স্কোয়ার’ (এখন বি-বা-দি ৰাগ) একেবারে খাঁ খাঁ করে। সেখানে ট্রাম, বাস, ট্যাক্সি, অটো, কিছুরই তখন দাপট থাকে না।

যেন মনে হয় দুর্গাপুজোর আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে তারাও নিজেদের স্ব স্ব আস্তানার কিছুটা সুস্থির হয়ে দম নিয়ে নিজেরা হাসি-ঠাট্টা করে – তাদের ভাবখানা এই রকম যেন অফিস পাড়া ডালহৌসীতে আজ বেরলেও চলে, না বেরলেও চলে, সোয়ারী তো পাওয়া যাবে না। অতীতে পূজার ক’দিন, ডালহৌসী পাড়ার শব্দমাত্র ছিল রাজভবনের ঢাকির উচ্চস্বরে ঢাক ও কাঁসির আওয়াজ আর তার মাঝে মাঝে নীচু স্বরে লাউড স্পীকারে রবীন্দ্র সংগীত – সেগুলো চলত একটানা দিনরাত্রি নদীর স্রোতের মতো। দেশ সদ্য স্বাধীন হবার পরে, ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট, ‘চক্রবর্তী রাজাগোপালাচারী’, পশ্চিম বাংলার প্রথম রাজ্যপাল হয়ে আসার পর থেকেই কলকাতা রাজভবনের তৎকালীন আবাসিকদের মধ্যে আলোচনা চলেছিল যে, যখন দেখা যাচ্ছে এই নতুন রাজ্যপাল ‘রাজাগোপালাচারী’ মাঝে মাঝেই রাজভবনের একতলার ঐতিহাসিক ‘মার্বেল হলে’ ‘ভাগবৎ কীর্তনের আসর’ বসাচ্ছেন এবং তার সঙ্গে ‘সত্যনারায়ণ পূজা’রও ব্যবস্থা হচ্ছে, তখন এই রাজ্যপাল ‘রাজাগোপালাচারী’কে ধরে দু’মাস বাদেই এই স্বাধীন ভারতের এই কলকাতার রাজভবনে প্রথম আনুষ্ঠানিক দুর্গাপূজা শুরু করতে হবে। আর সেটাই হয়েছিল।

রাজ্যপাল ‘চক্রবর্তী রাজগোপালাচারী’, তাঁর ষ্টাফদের এক কথায় এই দুর্গাপূজার সম্মতি দিয়ে দিয়েছিলেন এবং ভারত স্বাধীন হবার পরে, সেই ১৯৪৭ সালের দুর্গাপূজা আজও সাড়ম্বরে কলকাতার রাজভবনে অনুষ্ঠিত হয়ে চলেছে – নিষ্ঠা সহকারে, অত ঘুমধামে, অতি জৌলুসে। একসময়, দুর্গাপূজার দীর্ঘ ছুটিতে, ‘ডালহৌসী স্কোয়ারের’ সদাচঞ্চল জীবনে, এই পূজার দিনগুলি, ওই অঞ্চলের চারিপাশের অধিবাসীদের বেশ আনন্দ দান করত। এবং এটাও সত্য যে, এখন ‘ডালহৌসী স্কোয়ার’ সেই ব্রিটিশ জমানার মতো ভয়াবহ জনবিরল নয়, সেখানে এখন বহু বাঙালী, অবাঙালী, বৌদ্ধ, খৃষ্টান, পার্শী, মুসলমান প্রভৃতি বিভিন্ন জাতের লোক একত্রে বাস করেন। তাঁদের বাইরে, কিছু বিদেশিরও খোঁজ পাওয়া যাবে। আর এ ছাড়াও, অতীতে ওই লাটবাড়ীর লাটের দুর্গাপূজা দেখতে স্বদেশী বহু গণ্যমান্য লোক, সাহেব-সুবো, পূজার ক’দিন সেখানে প্রতিমা দর্শনের জন্য আসতেন। এই প্রবন্ধ, অতীতের কলকাতা রাজভবনের দুর্গাপূজার কিছু স্মৃতি নিয়ে।

রাজ্যপাল নিজেই রাজভবনের দুর্গাপূজা কমিটির চিরস্থায়ী প্রেসিডেন্ট, সেহেতু প্রথা করে প্রায় প্রতি দুর্গাপূজার মহাঅষ্টমীর দিন রাতে সন্ধ্যারতির সময় অবশ্যই তিনি ও তাঁর পরিবারের সকলে সেই পূজা দেখতে আসতেন এবং আজও আসেন। কারণ, প্রথাটি আজও প্রচলিত আছে। অতীতে তাঁরা প্রায় ঘন্টাখানেক সেখানে সময় কাটাতেন।