ছত্তিশগড়ের রাজধানী রায়পুর-ঝাঁ চকচকে মহানগরের ভিড় আর আকাশছোঁয়া দালানের দাপট এখানে নেই। বড় বড় শপিং মলের চাকচিক্যও চোখে পড়ে না তেমন। তবু এই শহরের আলাদা এক মাধুর্য আছে। মসৃণ পিচের রাস্তা, দু’ধারে সারি সারি সবুজ গাছ, চওড়া ফুটপাথ আর তুলনামূলক কম যানজট—সব মিলিয়ে রায়পুর যেন শান্ত, গোছানো আর স্বস্তির এক শহর। কয়েক বছর আগেই পরিচ্ছন্নতার নিরিখে দেশের সেরা শহরগুলির মধ্যে জায়গা করে নিয়েছিল এই নগরী। আর এখন সেই নিরিবিলি শহরই প্রাণচাঞ্চল্যে ভরে উঠেছে খেলা ইন্ডিয়া ট্রাইবাল গেমসের উন্মাদনায়।
দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তরুণ ক্রীড়াবিদরা ইতিমধ্যেই রায়পুরে পৌঁছতে শুরু করেছেন। বিমানবন্দরে নামলেই চোখে পড়ছে অসম, মণিপুর, তামিলনাড়ু, কর্নাটক কিংবা গোয়ার খেলোয়াড়দের দল। তাঁদের পোশাকেই স্পষ্ট নিজেদের রাজ্যের পরিচয়। সবার মধ্যেই রয়েছে উৎসাহ, গর্ব এবং প্রতিযোগিতার প্রস্তুতি। তবে এই ছবির বাইরে আলাদা করে নজর কাড়ছে বাংলা দলের অবস্থা। দীর্ঘ ট্রেনযাত্রা শেষে প্রায় ২৪ ঘণ্টা পর রায়পুরে পৌঁছেছে বাংলার ফুটবল দল। কিন্তু তাঁদের স্বাগত জানাতে আসা স্থানীয় শিল্পীরাও প্রথমে বুঝতেই পারেননি তাঁরা কোন রাজ্যের প্রতিনিধি।
কারণ, দলের খেলোয়াড়দের জন্য কোনও একরকম পোশাক বা ট্র্যাকস্যুটের ব্যবস্থা করা হয়নি। এমনকি সাধারণ পরিচয়বাহী টি-শার্টও দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ। অথচ এই বাংলার ফুটবল দলই এবারের প্রতিযোগিতায় সোনার দাবিদার হিসেবে ধরা হচ্ছে। দলে রয়েছেন অমিত টুডু, সুজল মুন্ডা, সৌগত হাঁসদা, সৌরভ সাব্বার, দিলীপ ওঁরাও, বিজয় মুর্মু ও মার্শাল কিস্কুর মতো পরিচিত ফুটবলাররা, যাঁরা কলকাতা লিগ ও সন্তোষ ট্রফিতে নিজেদের দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন।
খেলা ইন্ডিয়া প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের প্রতিভাবান ক্রীড়াবিদদের তুলে আনা ও উন্নত সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় উদ্যোগে আয়োজিত এই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী খেলোয়াড়রা পাচ্ছেন উন্নত মানের আবাসন, খাবার ও কিটসের সুবিধা। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, বাংলার ক্রীড়া সংস্থাগুলির অনীহার কারণে বহু প্রতিভাবান খেলোয়াড় এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বিশেষ করে হকি ও সাঁতার ইভেন্টে বাংলা দল অংশ নেয়নি। জানা গিয়েছে, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলির তরফে হয় দল পাঠাতে অস্বীকার করা হয়েছে, নয়তো কোনও সাড়া দেওয়া হয়নি। যদিও হকি খেলোয়াড়দের বড় অংশই আদিবাসী সম্প্রদায়ভুক্ত, তবুও বাংলা থেকে কোনও দল না পাঠানো নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। নিন্দুকদের মতে, রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কারণেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তবে এর মধ্যেই ব্যতিক্রম হিসেবে উঠে এসেছেন তিরন্দাজ গণেশ টুডু, যিনি নিজ যোগ্যতায় প্রতিযোগিতায় জায়গা করে নিয়েছেন এবং পদক জয়ের সম্ভাবনাও রয়েছে।
সব মিলিয়ে প্রায় তিন হাজার প্রতিযোগীর মধ্যে বাংলা থেকে অংশ নিচ্ছেন সীমিত সংখ্যক খেলোয়াড়। অভিযোগ, রাজ্য থেকে বিশেষ কোনও সহায়তা না পেলেও তাঁরা নিজেদের চেষ্টায় এখানে পৌঁছেছেন। আর এখানেই এসে পাচ্ছেন উন্নত সুযোগ-সুবিধা। এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে, প্রশাসনিক উদাসীনতা ও অহমের লড়াইয়ের মাঝে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কি খেলোয়াড়রাই?




















