ভাঙল দশকের ঐতিহ্য, রেড রোড ছেড়ে ব্রিগেডে ইদের নমাজ! কড়া নিয়মে ফাঁকা গরুর হাট

কলকাতা: একটা সময় কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ড মানেই ছিল বাম-ডান বা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের হাই-ভোল্টেজ সমাবেশের পীঠস্থান। কিন্তু সময় বদলাচ্ছে, আর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ধর্মের নতুন সমীকরণও মানিয়ে ...

By Moumita Biswas

Published:

Follow Us
Brigade Parade Ground Eid Namaz replacing Red Road in Kolkata

কলকাতা: একটা সময় কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ড মানেই ছিল বাম-ডান বা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের হাই-ভোল্টেজ সমাবেশের পীঠস্থান। কিন্তু সময় বদলাচ্ছে, আর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ধর্মের নতুন সমীকরণও মানিয়ে নিচ্ছে কলকাতার এই ঐতিহাসিক ময়দান। কিছুদিন আগেই এই ব্রিগেড সাক্ষী ছিল ‘লক্ষ কণ্ঠে গীতাপাঠ’ অনুষ্ঠানের। আর এবার ২০২৬-এর বকরি ইদের সকালে সম্প্রীতির এক নতুন কোলাজ দেখা গেল এখানে। সকাল সকাল প্রচুর সংখ্যক মানুষ হাজির হয়ে ব্রিগেডের ঘাসেই পাঠ করলেন ইদের নমাজ। (Brigade Parade Ground Eid Namaz replacing Red Road in Kolkata)

রেড রোডের ঐতিহ্য ও রাজনীতির চেনা রেওয়াজে ইতি

কলকাতার অন্যতম ব্যস্ত এবং গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা হলো রেড রোড, যা রাজভবন, হাইকোর্ট, বিধানসভা এবং ধর্মতলাকে সংযুক্ত করে। এই রাস্তার দুই ধারেই রয়েছে সেনার পূর্ব ভারতের সদর দফতর ও একাধিক নামী ফুটবল ক্লাব। বছরের দুটি ইদে এই রাস্তাতেই এতদিন ধরে নমাজ উদযাপিত হয়ে আসছিল। তৃণমূল জমানায় এই ধর্মীয় সমাবেশ একটি বড় রাজনৈতিক মাত্রাও পেয়েছিল। মাথায় কাপড় দিয়ে প্রতি বছর ইদের সকালে রেড রোডের মঞ্চে খোদ তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপস্থিতি ছিল বাংলার রাজনীতির চেনা রেওয়াজ ও চর্চার বিষয়বস্তু। যদিও রাজ্যের দুই প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু বা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে কখনও ইদের মঞ্চে দেখা যায়নি।

   

কিন্তু গত বছরই সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রিত এই এলাকায় নিরাপত্তার প্রশ্ন তুলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে রেড রোডে ইদ জামাত নিয়ে আপত্তি তোলা হয়েছিল। ফলে এবার আর সেখানে নমাজের অনুমতি মেলেনি। রাজ্যে নতুন বিজেপি সরকার গঠনের পর কলকাতার রাস্তায় নমাজ পড়া এখন পুরোপুরি বন্ধ। এমনকি জুম্মাবারেও আর রাস্তায় নয়, মূলত মসজিদেই নমাজ পাঠ করতে হচ্ছে পুণ্যার্থীদের।

সরকারি বিজ্ঞপ্তির কড়াকড়ি, ফাঁকা উত্তরের গরুর হাট

বকরি ইদের আগে এবার উত্তর কলকাতার বিভিন্ন গরু বিক্রির হাটগুলি ছিল কার্যত শুনশান। বুধবার কিছু বিক্রেতা গরু নিয়ে হাটে হাজির হলেও দিনভর বসে থেকে খদ্দের পাননি অনেকেই। এর পেছনে রয়েছে রাজ্য সরকারের কড়া আইনি খাঁড়া। গত ১৩ মে জারি করা এক বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট জানানো হয়েছে যে, ষাঁড়, বলদ, গরু, বাছুর এবং মোষের ক্ষেত্রে উপযুক্ত শংসাপত্র (ফিটনেস সার্টিফিকেট) ছাড়া জবাই করা যাবে না। তাও আবার প্রকাশ্য স্থানে নয়, শুধুমাত্র কর্তৃপক্ষ অনুমোদিত কসাইখানাতেই এই প্রক্রিয়া চালানো যাবে। বেআইনি পশু জবাই রুখতে বিভিন্ন এলাকায় পরিদর্শনের ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে সরকারি বাহিনীকে।

স্বাগত জানাল নাখোদা মসজিদও

বকরি ইদে গরু কুরবানি যে কোনও আবশ্যিক ধর্মীয় প্রথা নয় এবং ইসলাম ধর্মে এটি বাধ্যতামূলক নয়, তা আগেই সাফ জানিয়ে দিয়েছিল দেশের সুপ্রিম কোর্ট। সরকারের এই নতুন নিয়মকে স্বাগত জানিয়েছে কলকাতার ঐতিহ্যবাহী নাখোদা মসজিদও। মসজিদ কর্তৃপক্ষের তরফে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, রাজ্যের সরকার যখন প্রকাশ্য স্থানে প্রাণী জবাই নিষিদ্ধ করেছে, তখন বকরি ইদের দিনেও তা করা উচিত নয়। কারণ পাশে অন্য ধর্মের মানুষ থাকেন, তাঁদের অস্বস্তি হতে পারে। ফলে এবার অধিকাংশ এলাকাতেই গরুজবাই হয়নি।

রাস্তায় নমাজ বা প্রকাশ্য কুরবানির কড়াকড়ি থাকলেও বকরি ইদের চেনা আনন্দ ও সম্প্রীতির আবহে কোনও খামতি ছিল না। সকাল থেকেই মসজিদে মসজিদে চলেছে বিশেষ দোয়া। মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ একে অপরকে কোলাকুলি করে ইদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। ঘরে ঘরে তৈরি হয়েছে বিরিয়ানি, কোরমা, কাবাব, রেজালার মতো মাংসের সুস্বাদু পদ আর মিষ্টিমুখ করতে সেমাই-পায়েস। আত্মীয়-বন্ধুদের নিমন্ত্রণ আর ছোট-বড় সকলকে উপহার দেওয়ার চেনা রীতিতেই পালিত হলো বকরি ইদ।

ভিডিও নিউজ দেখুন

Moumita Biswas

দীর্ঘদিন ধরে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত। হাতেখড়ি হয়েছিল ‘একদিন’ সংবাদপত্র থেকে। দেশ ও রাজ্য রাজনীতির পাশাপাশি নানা বিষয়ে বিশ্লেষণধর্মী লেখা করেন।

Follow on Google