
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের (BJP strategy)আগে দেশের রাজনীতিতে নতুন করে আলোড়ন ফেলল বিজেপির একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত। অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার সাম্প্রতিক ঘোষণায় স্পষ্ট করা হয়েছে, রাজ্যের মুসলিম-প্রধান ২২টি বিধানসভা আসনে বিজেপি প্রার্থী দেবে না।
এই আসনগুলিতে মুসলিম জনসংখ্যা ৮০ শতাংশেরও বেশি। পরিবর্তে, বিজেপি ও এনডিএ জোট তাদের শক্তি কেন্দ্রীভূত করবে ১০৩ থেকে ১০৪টি হিন্দু-প্রধান ও আদিবাসী অধ্যুষিত আসনে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত শুধু অসম নয়, গোটা দেশের রাজনীতিতেই বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
মৌসম কংগ্রেসে ফেরায় শিবিরে ভাঙন, তৃণমূলে যোগদানে হুড়োহুড়ি
হিমন্ত বিশ্ব শর্মা জানিয়েছেন, ২০২৩ সালের পরিসীমা পুনর্নির্ধারণ (ডিলিমিটেশন) শেষে অসমের বিধানসভা আসনগুলির চরিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। নতুন সীমা অনুযায়ী রাজ্যের প্রায় ৮২ শতাংশ আসনেই হিন্দু বা আদিবাসী সংখ্যাগরিষ্ঠ। সেই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই বিজেপি তাদের ভোটব্যাঙ্ক সুসংহত করতে চাইছে।
মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, “যে আসনগুলিতে মুসলিম ভোটার ৮০ শতাংশের বেশি, সেখানে বিজেপির প্রার্থী দেওয়া রাজনৈতিকভাবে কার্যকর নয়। বরং আমরা সেই আসনগুলিতে মন দেব, যেখানে আমাদের আদর্শ ও উন্নয়নের বার্তা পৌঁছনোর বাস্তব সম্ভাবনা রয়েছে।”
এই ঘোষণার পেছনে অসমের দীর্ঘদিনের জনসংখ্যাগত ও রাজনৈতিক ইতিহাসও বড় ভূমিকা নিয়েছে। ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত চলা অসম আন্দোলন মূলত অবৈধ অভিবাসনের বিরোধিতাকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল। বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অনুপ্রবেশ ইস্যুতে রাজ্যে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল, তার রেশ আজও রয়ে গেছে। ২০১৯ সালে জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (এনআরসি) প্রকাশের পর সেই বিতর্ক আরও তীব্র হয়। এনআরসি-তে প্রায় ১৯ লক্ষ মানুষ নিজেদের নাম খুঁজে পাননি, যাদের একটি বড় অংশ ‘মিয়া’ মুসলিম বলে পরিচিত। এই ঘটনা অসমের সামাজিক ও রাজনৈতিক মেরুকরণকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
বিজেপির বর্তমান কৌশলকে অনেকেই সেই পটভূমিরই ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখছেন। দলটি মনে করছে, মুসলিম-প্রধান আসনগুলিতে প্রার্থী না দিয়ে তারা একদিকে যেমন নিজেদের শক্তিকে অপচয় থেকে বাঁচাবে, অন্যদিকে হিন্দু ও আদিবাসী ভোটারদের মধ্যে একটি স্পষ্ট বার্তা দেবে। বিজেপি নেতৃত্বের দাবি, এই সিদ্ধান্তের লক্ষ্য “স্থানীয় ও আদিবাসী স্বার্থ রক্ষা” এবং “অসমের সাংস্কৃতিক পরিচয় সংরক্ষণ”।
তবে এই সিদ্ধান্ত ঘিরে সমালোচনাও কম নয়। বিরোধী দলগুলি অভিযোগ তুলেছে, বিজেপি কার্যত সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকাগুলিকে রাজনৈতিক মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চাইছে। কংগ্রেস ও এআইইউডিএফের মতো দলগুলির বক্তব্য, গণতন্ত্রে সব নাগরিকের প্রতিনিধিত্ব সমান গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে কোনও সম্প্রদায়-প্রধান এলাকায় প্রার্থী না দেওয়া বিভাজনের রাজনীতিকেই উসকে দেয়। তাঁদের আশঙ্কা, এর ফলে রাজ্যে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ আরও তীব্র হবে।
অন্যদিকে, বিজেপির সমর্থকদের একাংশ মনে করছেন, এই কৌশল দীর্ঘমেয়াদে দলকে নির্বাচনী সুবিধা দেবে। তাঁদের যুক্তি, যেখানে বিজেপির জয়ের সম্ভাবনা কম, সেখানে শক্তি না খরচ করে দল যদি নিজের মূল ভোটব্যাঙ্কে মনোযোগ দেয়, তাহলে তা বাস্তববাদী সিদ্ধান্ত। পাশাপাশি, এই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে বিজেপির তরফে দেশজুড়ে অবৈধ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের দাবিও আরও জোরালো হয়েছে। অনেক নেতা দাবি তুলেছেন, অসমের মতো সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলিতে জাতীয় স্তরে কঠোর অভিবাসন নীতি প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিজেপির এই সিদ্ধান্ত অসমের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করছে। মুসলিম-প্রধান ২২টি আসনে প্রার্থী না দেওয়ার ঘোষণার মধ্য দিয়ে বিজেপি স্পষ্ট করে দিয়েছে, তারা কোন ভোটব্যাঙ্ককে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
এই কৌশল শেষ পর্যন্ত নির্বাচনী ফলাফলে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা জানতে এখন অপেক্ষা ভোটের ময়দানের। তবে নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও তীব্র হবে এবং অসমের রাজনীতি আগামী দিনে আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে।










