ধর্মের আগে দেশ নয়! ভারতীয় সংখ্যালঘুদের বিধান মুফতির

mufti-controversial-statement-religion-nation-india

নয়াদিল্লি: ভারতের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিসরে ফের তীব্র বিতর্কের (Mufti controversial statement)জন্ম দিয়েছে এক মুফতির মন্তব্য। সম্প্রতি এক ধর্মীয় সমাবেশে দেওয়া বক্তৃতায় ওই মুফতি দাবি করেন, ভারতের মুসলিমরা “ভুল পথে হেঁটেছেন”, কারণ তাঁরা ধর্মের (মজহাব) আগে দেশকে এবং ইসলামের বিধানের বদলে ধর্মনিরপেক্ষতাকে প্রাধান্য দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যে তিনি অনুসারীদের শুধু ‘দীন’ অনুসরণের আহ্বান জানান এবং শরিয়াভিত্তিক জীবনব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে চেষ্টা করার কথাও বলেন।

Advertisements

এই মন্তব্য প্রকাশ্যে আসতেই দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। বহু রাজনৈতিক নেতা, সংবিধান বিশেষজ্ঞ এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা প্রশ্ন তুলেছেন এই বক্তব্য কি আসলে দেশের সাংবিধানিক কাঠামো ও আইনের শাসনের বিরুদ্ধে এক ধরনের আহ্বান? সমালোচকদের মতে, কোনও ধর্মীয় নেতা যখন প্রকাশ্যে জাতিরাষ্ট্রের গুরুত্ব খাটো করার কথা বলেন এবং ধর্মীয় আইনের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার কথা তোলেন, তখন তা সমাজে বিভাজন ও উগ্রপন্থার বীজ বপন করতে পারে।

   

সেঞ্চুরি করেও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ! এই ক্রিকেটারকে নিয়ে বড় সিদ্ধান্তের পথে BCCI

মুফতির বক্তব্যে সবচেয়ে বিতর্কিত অংশ ছিল তাঁর মন্তব্য ভারতের মুসলিমরা নাকি ধর্মনিরপেক্ষতাকে বেছে নিয়ে ভুল করেছেন। তাঁর মতে, একজন মুসলিমের প্রথম পরিচয় ধর্মীয় হওয়া উচিত, নাগরিক পরিচয় নয়। এই বক্তব্যের পরই প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে কি তিনি কার্যত সংবিধানের মৌলিক কাঠামো যেখানে ধর্মনিরপেক্ষতা একটি মূল স্তম্ভ তা অস্বীকার করছেন?

আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, ভারতের সংবিধান প্রত্যেক নাগরিককে ধর্ম পালনের স্বাধীনতা দেয়, কিন্তু একই সঙ্গে দেশের আইন ও সংবিধানের ঊর্ধ্বে কোনও ধর্মীয় বিধানকে স্থান দেয় না। তাঁদের বক্তব্য, শরিয়াভিত্তিক কোনও সমান্তরাল আইনি ব্যবস্থা কল্পনা করা সংবিধানবিরোধী এবং তা দেশের আইনের শাসনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

অন্যদিকে, মুসলিম সমাজের মধ্য থেকেই এই বক্তব্যের বিরোধিতা শুরু হয়েছে। একাধিক বিশিষ্ট ইসলামিক চিন্তাবিদ ও সমাজকর্মী প্রকাশ্যে জানিয়েছেন, ইসলাম কখনওই নাগরিক দায়িত্ব বা দেশের প্রতি আনুগত্যের বিরোধিতা করে না। তাঁদের মতে, ভারতের মুসলিমরা স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে শুরু করে দেশ গঠনের প্রতিটি পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তাই ধর্ম ও দেশের মধ্যে কৃত্রিম বিভাজন টেনে আনা ইতিহাস ও বাস্তবতার সঙ্গে অসঙ্গত।

রাজনৈতিক মহলেও এই মন্তব্য ঘিরে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। শাসক ও বিরোধী উভয় পক্ষের নেতারাই একে বিপজ্জনক ও বিভাজনমূলক বলে আখ্যা দিয়েছেন। অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, এই ধরনের বক্তব্য তরুণদের মধ্যে উগ্রবাদী চিন্তাধারাকে উসকে দিতে পারে। সামাজিক মাধ্যমে ইতিমধ্যেই ‘র‍্যাডিকালাইজেশন’ বা উগ্রপন্থায় প্ররোচনার অভিযোগে বিষয়টি নিয়ে তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়েছে।

তবে মুফতির সমর্থকরা দাবি করেছেন, তাঁর বক্তব্যকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। তাঁদের মতে, তিনি কাউকে দেশের বিরুদ্ধে যেতে বলেননি, বরং ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলার কথা বলেছেন। যদিও সমালোচকরা পাল্টা প্রশ্ন তুলেছেন যখন ‘দেশ’ ও ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’কে সরাসরি ভুল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, তখন সেই বক্তব্য কীভাবে নিরীহ হতে পারে?

এই ঘটনার প্রেক্ষিতে আবারও সামনে এসেছে প্রশ্ন ভারতের মতো বহুধর্মীয়, বহুভাষিক দেশে ধর্মীয় নেতাদের বক্তব্যের দায়িত্ব কতটা? বিশেষজ্ঞদের মতে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকলেও তা যেন সমাজে বিদ্বেষ, বিভাজন বা আইনের শাসনের প্রতি অবিশ্বাস তৈরি না করে, সেদিকে সতর্ক থাকা জরুরি। বিতর্ক চলছেই, তবে একথা স্পষ্ট এই মন্তব্য নতুন করে ধর্ম, রাষ্ট্র ও সংবিধানের সম্পর্ক নিয়ে জাতীয় স্তরে আলোচনা উসকে দিয়েছে।

এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ খবর পেতে Google News-এ Kolkata24x7 ফলো করুন
Advertisements