‘চিকেনস নেক’ থেকে ‘এলিফ্যান্টস ট্রাঙ্ক’! শিলিগুড়ি করিডরের সুরক্ষায় বদল আনল ভারত

নয়াদিল্লি: দশকের পর দশক ধরে সামরিক কৌশলবিদ ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে উত্তরবঙ্গের শিলিগুড়ি করিডর ছিল দেশের মানচিত্রে এক চরম স্পর্শকাতর ও দুর্বল ভূখণ্ড। ১৭ থেকে…

নয়াদিল্লি: দশকের পর দশক ধরে সামরিক কৌশলবিদ ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে উত্তরবঙ্গের শিলিগুড়ি করিডর ছিল দেশের মানচিত্রে এক চরম স্পর্শকাতর ও দুর্বল ভূখণ্ড। ১৭ থেকে ২২ কিলোমিটার চওড়া উত্তরবঙ্গের এই সরু ফালিটি ‘চিকেনস নেক’ বা ‘মুরগির গলা’ নামেই পরিচিত। মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে দেশের আটটি উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যকে জোড়ার একমাত্র স্থলপথ এটি। দেশের বাকি অংশের সঙ্গে উত্তর-পূর্ব ভারতের রেল, সড়ক, জ্বালানি এবং সামরিক রসদ সরবরাহের একমাত্র জীবনরেখাও এই করিডর। স্বাভাবিকভাবেই, বড় কোনো সংঘাতে এই পথ অবরুদ্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাকে এতদিন ভারতের সবচেয়ে বড় কৌশলগত দুর্বলতা হিসেবেই দেখা হতো।

তবে সেনার শীর্ষমহলের দাবি, বিগত কয়েক বছরে সেই পুরনো ধারণায় এক বিরাট পরিবর্তন এসেছে। ভঙ্গুর বা সহজেই অবরুদ্ধ হয়ে যেতে পারে এমন কোনো সরু গলার প্রতীক হিসেবে নয়, বরং বর্তমান সেনাকর্তারা এই করিডরকে দেখছেন ‘এলিফ্যান্টস ট্রাঙ্ক’ বা ‘হাতির শুঁড়’ হিসেবে, যা অত্যন্ত শক্তিশালী, নমনীয় এবং কেবল আত্মরক্ষা নয়, বরং যে কোনো আক্রমণ প্রতিহত করে পালটা আঘাত হানতে সক্ষম।

Advertisements

২০১৪ সাল থেকে রূপান্তরের শুরু

২০১৪ সালের পর থেকে ভারতের পূর্ব সীমান্তে কৌশলগত সুরক্ষার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছে কেন্দ্র। সামরিক পরিকাঠামো, সীমান্ত সংযোগ, নজরদারি ব্যবস্থা এবং লজিস্টিক নেটওয়ার্কে একের পর এক বিনিয়োগের ফলে শিলিগুড়ি করিডরের চিত্রটাই বদলে গেছে।

লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট, ঐতিহাসিকভাবে স্পর্শকাতর একটি যাতায়াত পথকে এমন এক দুর্ভেদ্য ও সুরক্ষিত গেটওয়েতে পরিণত করা, যা শান্তি ও যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে সমানভাবে দ্রুত সেনা এবং রসদ সরাতে সক্ষম। ইস্টার্ন কমান্ডের এক বরিষ্ঠ সেনা আধিকারিক জানিয়েছেন, ফরোয়ার্ড পরিকাঠামো এবং স্থায়ী সেনা মোতায়েনের মাধ্যমে এই করিডরকে এক অপ্রতিরোধ্য অবস্থানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ‘চিকেনস নেক’-এর সেই দুর্বল জায়গা কাটিয়ে এটি এখন এক পেশিবহুল ‘এলিফ্যান্টস ট্রাঙ্ক’-এ রূপান্তরিত হয়েছে, যা পথের সমস্ত বাধা নিমেষে দূর করতে পটু।

ত্রিস্তরীয় সুরক্ষা বলয়

এই কৌশলগত বদলের মূল ভিত্তি হলো করিডরের চারপাশে তৈরি হওয়া তিনটি নতুন সামরিক ঘাঁটি:

লাচিত বরফুকন মিলিটারি স্টেশন (আসাম): ধুবুরির কাছে বামুনিতে অবস্থিত এই ঘাঁটিটি পূর্ব সীমান্তে সেনা চলাচল, অস্ত্রশস্ত্র সংরক্ষণ এবং লজিস্টিক সহায়তার অন্যতম বড় কেন্দ্র।

কিশোরগঞ্জ ফরোয়ার্ড বেস (বিহার): করিডরের পশ্চিমের প্রবেশদ্বার সুরক্ষিত করার পাশাপাশি উত্তর-পূর্বমুখী সেনা বাহিনীকে দ্রুত সাহায্য করতে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

চোপড়া ফরোয়ার্ড বেস (পশ্চিমবঙ্গ): আন্তর্জাতিক সীমান্তের একেবারে কাছে অবস্থিত এই ঘাঁটিটি করিডরের সবচেয়ে সরু অংশের ওপর ২৪ ঘণ্টা নজরদারি চালায় এবং আপৎকালীন পরিস্থিতিতে দ্রুত পদক্ষেপ নিশ্চিত করে।

বিএসএফ (BSF)-এর সঙ্গে হাত মিলিয়ে এই ঘাঁটিগুলি এমন এক সমন্বিত ইকোসিস্টেম তৈরি করেছে, যা গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ থেকে শুরু করে দ্রুত সেনা মোতায়েনে সিদ্ধহস্ত।

প্রতিবেশী ও চিনা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা

বাংলাদেশ সীমান্ত: সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও নজরদারি আরও আঁটসাঁট করা হয়েছে। চোপড়া ফরোয়ার্ড বেস এই ক্ষেত্রে অপ্রত্যাশিত আক্রমণ ঠেকানোর ক্ষেত্রে অত্যন্ত বড় ভূমিকা পালন করছে।

চিন ও চুম্বী উপত্যকা: সিকিম ও ভুটানের মাঝে অবস্থিত চুম্বী উপত্যকার চিনা আগ্রাসনের গতিপ্রকৃতির ওপর বরাবরই নজর রেখেছে ভারত। এই হুমকি রুখতে ত্রিশক্তি কর্পসকে এস-৪০০ (S-400) এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম, ব্রাহ্মোস (BrahMos) সুপারসনিক ক্রুজ মিসাইল এবং হাসিমারা থেকে উড়ান নামানো রাফাল (Rafale) যুদ্ধবিমানের মতো অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত করা হয়েছে।

পরিকাঠামোই আসল শক্তি

কেবল সৈন্য বা অস্ত্রশস্ত্রই নয়, গোটা অঞ্চলে যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটানো হয়েছে। সীমান্ত এলাকার কৌশলগত হাইওয়ে চওড়া করা, রেল আধুনিকীকরণ এবং যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি মোকাবিলায় ভূগর্ভস্থ রেল পরিকাঠামোর মতো একাধিক পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। এছাড়া মিয়ানমারের কালদান প্রকল্পের মতো বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরির কাজও চলছে, যাতে একক স্থলপথের ওপর নির্ভরতা পুরোপুরি কমানো যায়।

সংক্ষেপে বলতে গেলে, এককালের ‘দুর্বল ভূখণ্ড’ বা ‘চিকেনস নেক’ আজ ভারতের পূর্ব সীমান্তের অন্যতম সুরক্ষিত ও শক্তিশালী করিডর। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ‘এলিফ্যান্টস ট্রাঙ্ক’ রূপকটিই প্রমাণ করে যে ভারত এখন কেবল সীমান্ত রক্ষা করতেই নয়, বরং যে কোনো আক্রমণ প্রতিহত করতে পুরোপুরি প্রস্তুত।

‘ঘোর পাপ’ পেপার লিক! দোষীদের কঠোর সাজা দিতে ফাস্ট ট্র্যাক কোর্ট গড়ার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

অনশন ভাঙার আবেদনে ধন্যবাদ জানিয়ে নাড্ডা-জিতেন্দ্রকে খোলা চিঠি সোনমের