বঙ্গোপসাগরে তৈরি ঘূর্ণিঝড় ‘ডিটওয়া’ ক্রমেই শক্তি সঞ্চয় করছে। শুক্রবার সকাল থেকেই এর প্রভাবে দক্ষিণ ভারতের বিস্তীর্ণ উপকূলজুড়ে উত্তেজনা, আশঙ্কা এবং প্রস্তুতির চিত্র ফুটে উঠেছে। গভীর নিম্নচাপ থেকে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেওয়ার পর এই ঝড় এখন সরাসরি তামিলনাড়ু–পুদুচেরি–অন্ধ্র উপকূলের দিকে এগোচ্ছে। ভারতীয় আবহাওয়া দফতর (আইএমডি) জানিয়েছে, ৩০ নভেম্বর ভোরের দিকেই এর সম্ভাব্য ল্যান্ডফল। শ্রীলংকায় এখনও পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ১২৩ জনের। ১৫০০০ বাড়ি জলের নিচে। ভারত ইতিমধ্যেই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে।
ঝড়ের গতিপথ, তীব্রতা এবং সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে আগাম সতর্কতা জারি হওয়ায় দক্ষিণ ভারতের বহু জেলা এখন রেড ও অরেঞ্জ অ্যালার্ট জোনে। আইএমডি রাতের বুলেটিনে জানিয়েছিল, বৃহস্পতিবার গভীর রাতে ঝড়টি ৯.০° উত্তর অক্ষাংশ ও ৮০.৮° পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অবস্থান করছিল। আনুমানিক ঘণ্টায় ৭ কিলোমিটার বেগে উত্তর-উত্তরপশ্চিম দিকে সরে এসে এটি তখন কারাইকাল থেকে প্রায় ২৪০ কিমি দক্ষিণ-দক্ষিণপূর্বে, পুদুচেরি থেকে ৩৫০ কিমি দক্ষিণ-দক্ষিণপূর্বে এবং চেন্নাই থেকে প্রায় ৪৫০ কিমি দক্ষিণে ছিল।
৪,০০০ মিটার উচ্চতায় মানবহীন হেলিকপ্টার থেকে প্রথম লাইভ মিসাইল পরীক্ষা সফল চিনের
তামিলনাড়ুর উপকূলবর্তী জেলা জুড়ে ইতিমধ্যেই প্রশাসনিক প্রস্তুতি জোরদার। পুদুচেরি, কাডালোর, ভিল্লুপুরম, ময়িলাদুথুরাই, চেঙ্গালপট্টু—এসব জেলায় আজ ও আগামীকাল অত্যন্ত ভারী বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা রয়েছে। চেন্নাই, তিরুভান্নামলাই, তাঞ্জাভুর, তিরুভারুর, নাগাপট্টিনমসহ উত্তর ও মধ্য তামিলনাড়ুর বহু জেলায় অরেঞ্জ অ্যালার্ট জারি।
আইএমডি জানিয়েছে, ল্যান্ডফলের সময় ঘন্টায় ৭০–৯০ কিমি বেগের ঝোড়ো হাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা পরে ১০০ কিমিতেও পৌঁছাতে পারে। উপকূলবর্তী এলাকায় জলোচ্ছ্বাস ও গাছ উপড়ে পড়ার মতো বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক প্রশাসন।
ঘূর্ণিঝড় ডিটওয়ার প্রভাবে দক্ষিণ ভারতের অন্য রাজ্যগুলিও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অন্ধ্রপ্রদেশের উপকূলবর্তী অঞ্চল, ইয়ানাম ও রায়ালসীমায় ২৯ নভেম্বর থেকে ১ ডিসেম্বরের মধ্যে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে। ৩০ নভেম্বর বিচ্ছিন্নভাবে অতি অতি ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না আবহবিদরা।
কেরলের ইডুক্কি জেলার তিনটি গুরুত্বপূর্ণ জলাধারে জলের স্তর দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে। ত্রিশূর ও কোঝিকোডের জলাধারগুলিও অরেঞ্জ অ্যালার্টে রয়েছে। কেরল স্টেট ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অথরিটি বাসিন্দাদের সতর্ক থাকতে নির্দেশ দিয়েছে নদীর ধারে, পাহাড়ি ঢালে বা ভূমিধসপ্রবণ এলাকায় অযথা কেউ যাতে না থাকে সেজন্য বিশেষ নজরদারি চালানো হচ্ছে। কর্ণাটক ও তেলেঙ্গানায়ও আগামী ৪৮ ঘণ্টা ভারী বৃষ্টি, বজ্রবিদ্যুৎ এবং ঝোড়ো হাওয়া প্রবল হতে পারে বলে সতর্কতা জারি হয়েছে।
ডিটওয়ার প্রভাবে ইতিমধ্যেই যাতায়াত ব্যবস্থায় বড় প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। চেন্নাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ২৯ নভেম্বর বেশ কয়েকটি বিমান পরিষেবা বাতিল করা হয়েছে। প্রবল বাতাস, নিম্ন দৃষ্টি-মান এবং বৃষ্টির কারণে রানওয়ের কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ায় আরও বাতিল বা দেরির সম্ভাবনা রয়েছে।
ইন্ডিগো এক্স প্ল্যাটফর্মে যাত্রীদের সতর্ক করে জানিয়েছে—জাফনা, পুদুচেরি, তুতুকুড়িন এবং তিরুচিরাপল্লি-সহ বেশ কিছু রুটে দেরি বা বাতিলের আশঙ্কা রয়েছে। রেল পরিষেবাতেও বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। সাউদার্ন রেলওয়ে ২৮ ও ২৯ নভেম্বরের কয়েকটি ট্রেন বাতিল, আংশিক বাতিল বা শর্ট-টার্মিনেট করেছে। আইএমডির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ঝড় তীব্র হলে আরও রেলযাত্রা ব্যাহত হতে পারে।
এদিকে উপকূলবর্তী এলাকায় মৎস্যজীবীদের সমুদ্রে যেতে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রেখেছে এবং প্রয়োজন হলে বৃহৎ পরিসরের উদ্ধারকাজ শুরু হবে বলে জানিয়েছে। দক্ষিণ ভারত জুড়ে তাই এখন একটাই প্রহর গোনা—কবে এবং কতটা শক্তি নিয়ে আছড়ে পড়বে ঘূর্ণিঝড় ডিটওয়া।
