
দেশের তথাকথিত ‘সিলিকন ভ্যালি’ বেঙ্গালুরু (Bangalore) যেখানে আইটি কর্মী, স্টার্টআপ, কর্পোরেট অফিসের ভিড়—সেই শহরেই মোবাইল ফোন চুরির ভয়াবহ চিত্র সামনে এল। সরকারি CEIR (Central Equipment Identity Register)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম আট মাসেই বেঙ্গালুরুতে চুরি হয়েছে ১ লক্ষ ৭৯ হাজার ২৮৫টি মোবাইল ফোন। অর্থাৎ গড়ে প্রতি ২ মিনিটে একটি করে মোবাইল ফোন চুরি, দৈনিক প্রায় ৭৪৭টি ফোন! ডিসেম্বর ২০২৫-এ প্রকাশিত Bangalore Mirror-এর রিপোর্টে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
এই পরিসংখ্যান শুধু একটি শহরের অপরাধচিত্র নয়, বরং দেশের দ্রুত বর্ধনশীল মহানগরগুলির নিরাপত্তা ব্যবস্থার বড় ফাঁকফোকরকেই তুলে ধরছে। বিশেষ করে বেঙ্গালুরুতে বিপুল সংখ্যক বাঙালি আইটি কর্মী, পড়ুয়া ও পেশাজীবী থাকায় বিষয়টি বাঙালি সমাজের মধ্যেও গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।
কীভাবে চলছে চুরির কারবার?
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, অধিকাংশ মোবাইল চুরির পিছনে রয়েছে সংগঠিত দুই-চাকার গ্যাং। সাধারণত দু’জন বা তিনজন একটি বাইকে চেপে ভিড়পূর্ণ এলাকায় ঘোরাফেরা করে। মেট্রো স্টেশন, বাসস্ট্যান্ড, বাজার, শপিং মল, অফিস টাইমে ব্যস্ত রাস্তা—এই সব জায়গাই তাদের মূল টার্গেট। কারও হাতে ফোন দেখলেই আচমকা টান মেরে বাইক ছুটিয়ে পালিয়ে যায় দুষ্কৃতীরা।
বিশেষ করে মেট্রো স্টেশনের সিঁড়ি, এসকালেটর বা গেটের কাছে দাঁড়িয়ে ফোন ব্যবহার করা মানুষজনই বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ জানানোর আগেই ফোন অন্য জেলায় বা অন্য রাজ্যে পাচার হয়ে যাচ্ছে।
পুলিশের অভিযান ও উদ্ধার
ক্রমবর্ধমান অভিযোগের ভিত্তিতে বেঙ্গালুরু পুলিশ সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক বড় অভিযান চালিয়েছে। এক বিশেষ অভিযানে ৪২ জন অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং তাদের কাছ থেকে ১,৯৪৯টি চুরি যাওয়া মোবাইল ফোন উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। পুলিশের দাবি, এই গ্যাংগুলির সঙ্গে আন্তঃরাজ্য চোরাচালান চক্রেরও যোগ রয়েছে। চুরি যাওয়া ফোনগুলি দ্রুত ফ্ল্যাশ করে বা যন্ত্রাংশ খুলে আলাদা করে বিক্রি করা হয়, ফলে সেগুলি ট্র্যাক করা কঠিন হয়ে পড়ে।
CEIR পোর্টালের মাধ্যমে চুরি যাওয়া ফোন ব্লক করার ব্যবস্থা থাকলেও, অনেকেই বিষয়টি জানেন না বা দেরিতে অভিযোগ করেন। ফলে অপরাধীরা সেই সুযোগটাই নিচ্ছে।
কেন বেঙ্গালুরুতেই এত বেশি চুরি?
বিশেষজ্ঞদের মতে, বেঙ্গালুরুর দ্রুত নগরায়ণ, জনসংখ্যার চাপ, গণপরিবহণে অতিরিক্ত ভিড় এবং প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাপন—সব মিলিয়েই শহরটিকে মোবাইল চোরদের জন্য ‘সহজ টার্গেট’ করে তুলেছে। দেশের প্রযুক্তি রাজধানী হলেও নজরদারি ব্যবস্থা এখনও অনেক জায়গায় অপর্যাপ্ত। বহু এলাকায় সিসিটিভি থাকলেও সেগুলির রক্ষণাবেক্ষণ ও রিয়েল-টাইম মনিটরিং যথেষ্ট নয় বলে অভিযোগ।
সাধারণ মানুষের কী করণীয়?
পুলিশ ও সাইবার বিশেষজ্ঞরা একাধিক সতর্কতা জারি করেছেন—
- ভিড়ের মধ্যে প্রকাশ্যে ফোন ব্যবহার এড়িয়ে চলা
- বাইকের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে ফোনে কথা না বলা
- চুরি হলে সঙ্গে সঙ্গে থানায় অভিযোগ ও CEIR-এ ফোন ব্লক করা
- ফোনে ট্র্যাকিং ও সিকিউরিটি ফিচার সক্রিয় রাখা
বড় প্রশ্ন নিরাপত্তা নিয়ে
প্রতি দুই মিনিটে একটি মোবাইল চুরির এই তথ্য শুধু বেঙ্গালুরুর আইনশৃঙ্খলা নয়, দেশের অন্যান্য মহানগরের জন্যও এক সতর্কবার্তা। যেখানে ডিজিটাল লেনদেন, অফিসিয়াল ডেটা ও ব্যক্তিগত তথ্য সবই মোবাইল ফোনে বন্দি, সেখানে একটি ফোন চুরি মানে শুধুই আর্থিক ক্ষতি নয়—ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বড় ঝুঁকি।
প্রযুক্তির শহরে প্রযুক্তিই যদি মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে না পারে, তাহলে প্রশ্ন উঠছে—নগর নিরাপত্তা ব্যবস্থা আদৌ কতটা প্রস্তুত? বেঙ্গালুরুর এই ভয়াবহ পরিসংখ্যান হয়তো গোটা দেশের জন্যই এক বড় অ্যালার্ম।










