আমেরিকার অভিবাসন নীতিতে সাম্প্রতিক কড়াকড়ির জেরে বড়সড় সংকটে পড়েছেন বহু ভারতীয় এইচ-১বি (H-1B) ভিসাধারী। কাজের ভিসা নবীকরণের জন্য চলতি মাসে ভারতে এসে আটকে পড়েছেন শতাধিক উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন ভারতীয় কর্মী। এই পরিস্থিতিকে “এতদিনে দেখা সবচেয়ে বড় বিশৃঙ্খলা” বলে আখ্যা দিয়েছেন অভিবাসন আইনজীবীরা।
ওয়াশিংটন পোস্ট-এর একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ডিসেম্বর ১৫ থেকে ২৬—এই সময়কালের মধ্যে বহু এইচ-১বি ভিসা নবীকরণের সাক্ষাৎকার হঠাৎ করেই বাতিল বা পুনর্নির্ধারিত করা হয়েছে। এই সময়টি আবার মার্কিন ছুটির মরসুমের সঙ্গে মিলে যাওয়ায় সমস্যার তীব্রতা আরও বেড়েছে। ফলে বহু ভারতীয় কর্মী কাজের জায়গায় ফিরতে না পেরে ভারতে আটকে পড়েছেন।
হিউস্টনভিত্তিক অভিবাসন আইন সংস্থা রেড্ডি নিউম্যান ব্রাউন পিসি-র পার্টনার এমিলি নিউম্যান জানিয়েছেন, তাঁর সংস্থারই অন্তত ১০০ জন ক্লায়েন্ট বর্তমানে ভারতে আটকে রয়েছেন। ভারতে কর্মরত অভিবাসন আইনজীবী বীণা বিজয় আনন্দ এবং আটলান্টার আইনজীবী চার্লস কুকও জানিয়েছেন, তাঁদের কাছেও একাধিক এমন মামলা এসেছে।
ওয়াশিংটন পোস্ট-কে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় বীণা বিজয় আনন্দ বলেন, “এটাই সবচেয়ে বড় বিশৃঙ্খলা, যা আমরা কখনও দেখেছি। আদৌ কোনও পরিকল্পনা আছে কি না, তা নিয়েই সন্দেহ।” এমিলি নিউম্যানের প্রশ্ন, “কতদিন পর্যন্ত সংস্থাগুলি এই কর্মীদের জন্য অপেক্ষা করতে রাজি থাকবে?”
প্রসঙ্গত, এপ্রিল ২০২৫-এ প্রকাশিত মার্কিন নাগরিকত্ব ও অভিবাসন পরিষেবা (USCIS)-এর এক রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্বের মোট এইচ-১বি ভিসাধারীর ৭১ শতাংশই ভারতীয়। ফলে এই সমস্যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে ভারতীয় আইটি ও প্রযুক্তি পেশাজীবীদের উপর।
এদিকে এই জটিলতা নিয়ে মার্কিন বিদেশ দপ্তরের ব্যাখ্যাও সামনে এসেছে। দপ্তরের দাবি, ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন সোশ্যাল মিডিয়া ভেটিং নীতি চালু হওয়ার পরই ভিসা সাক্ষাৎকারে দেরি হচ্ছে। জাতীয় নিরাপত্তা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই অতিরিক্ত যাচাই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
মার্কিন বিদেশ দপ্তরের এক মুখপাত্রের কথায়,
“আগে যেখানে দ্রুত ভিসা প্রক্রিয়া ও অপেক্ষার সময় কমানোর উপর জোর ছিল, এখন ভারত-সহ বিশ্বের সব দূতাবাস ও কনস্যুলেট প্রতিটি আবেদন কঠোরভাবে যাচাই করাকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে।”
১০ ডিসেম্বর ভারতে মার্কিন দূতাবাসও একটি বিবৃতি জারি করে জানায়, এইচ-১বি বিশেষ পেশার কর্মী এবং তাঁদের এইচ-৪ নির্ভরশীলদের ক্ষেত্রেও সোশ্যাল মিডিয়া ও অনলাইন উপস্থিতি খতিয়ে দেখা হবে। এতদিন এই ধরনের অনলাইন যাচাই মূলত ছাত্র ও এক্সচেঞ্জ ভিসা—এফ (F), এম (M) এবং জে (J)—শ্রেণির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য ছিল। তবে ১৫ ডিসেম্বর থেকে এইচ-১বি ও এইচ-৪ ভিসাধারীরাও এর আওতায় পড়েছেন।
উল্লেখযোগ্যভাবে, চলতি বছরের জুলাই মাসে মার্কিন বিদেশ দপ্তর ঘোষণা করে যে, ২ সেপ্টেম্বর থেকে তৃতীয় কোনও দেশে বসে এইচ-১বি ভিসা নবীকরণ করা যাবে না। এরপর ১৯ সেপ্টেম্বর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন এইচ-১বি আবেদনের ক্ষেত্রে ১ লক্ষ ডলার ফি আরোপের ঘোষণায় সই করেন। যদিও এই ফি শুধুমাত্র ২১ সেপ্টেম্বরের পর নতুন আবেদন বা এইচ-১বি লটারিতে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
সব মিলিয়ে, একের পর এক নীতিগত কড়াকড়ি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন হাজার হাজার ভারতীয় এইচ-১বি কর্মী। ছুটির মরসুমে দেশে ফিরে আটকে পড়া এই পেশাজীবীরা কবে কাজে ফিরতে পারবেন, তা নিয়ে এখন বড় প্রশ্নচিহ্ন। অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকটের দ্রুত সমাধান না হলে তার প্রভাব মার্কিন সংস্থাগুলির উপরও পড়তে পারে।




















