২০০০ সালের ১লা এপ্রিল… এই দিনটা শুধু একটি তারিখ নয়, উত্তর ২৪ পরগনা তথা নৈহাটি-নোয়াপাড়ার রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গভীর ক্ষতের দিন। এই দিনেই নির্মমভাবে খুন হন বামফ্রন্ট বিরোধী আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ মুখ, তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাতা স্তম্ভদের একজন, বিকাশ বসু। আজ ২৬ বছর পেরিয়ে গেছে, কিন্তু প্রশ্নটা এখনও একই জায়গায় দাঁড়িয়ে, বিকাশ বসুর খুনের বিচার কি সত্যিই হয়েছে?
বিকাশ বসুর রক্তে ভিজে তৈরি হয়েছিল নোয়াপাড়ার রাজনৈতিক মাটি। তাঁর মৃত্যুর পর তৎকালীন বিরোধী নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ছুটে এসেছিলেন ঠিকই, কিন্তু সেই দিনের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে এখনও নানা প্রশ্ন ঘোরাফেরা করে মানুষের মনে। বহু স্থানীয় মানুষের দাবি, সেদিন সেখানে উপস্থিত ছিলেন না জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক এবং মুকুল রায়। অথচ উপস্থিত ছিলেন অর্জুন সিং, যাকে তৃণমূলের একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে “খুনি” বলে আখ্যা দিয়ে এসেছে।
কিন্তু এখানেই সবচেয়ে বড় দ্বন্দ্ব, যদি তিনি খুনি হন, তাহলে উচ্চ আদালত তাঁকে বেকসুর খালাস দিল কেন? আদালতের রায় কি তাহলে মিথ্যে? নাকি রাজনৈতিক প্রয়োজনে চরিত্রহনন? এই দ্বিচারিতা সাধারণ মানুষের চোখ এড়ায় না।
২৬ বছর কেটে গেল, কিন্তু বিকাশ বসুর হত্যার প্রকৃত রহস্য আজও অন্ধকারেই। কেউ দায় নিল না, কেউ জবাব দিল না। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ঘটনার রাজনৈতিক ব্যবহার বেড়েছে, সত্যের অনুসন্ধান নয়।
এরপর আসে আরও এক বেদনাদায়ক অধ্যায়, ধর্নামঞ্চে বিকাশ বসুর স্মৃতির অপমান। যাঁর রক্তে দল গড়ে উঠেছে, তাঁর পরিবারকেই প্রকাশ্যে অসম্মান করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই জনসভায় এসে বলেন, “মঞ্জু বসুকে আমি তিনবার জিতিয়েছি।”
প্রশ্ন উঠছে, তাহলে তিনি দু’বার হারালেন?
মানুষের মনে এই প্রশ্নগুলো ক্রমশ জোরাল হচ্ছে।
“এফোর্ট কম ছিল”- এই মন্তব্য কি একজন শহীদের স্ত্রীর প্রতি সম্মানজনক? এই “এফোর্ট” শব্দের অন্তর্নিহিত অর্থ কী? এটা কি শুধুই রাজনৈতিক পরিভাষা, না কি এর মধ্যে লুকিয়ে আছে অবজ্ঞা?
আজ দেখা যাচ্ছে, তৃণমূলের প্রার্থী তৃণাঙ্কুর ভট্টাচার্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবি ছেড়ে শহীদ বিকাশ বসুর ছবি নিয়ে ঘুরছেন।
কেন?
এটা কি মানুষের আবেগকে ব্যবহার করার চেষ্টা?
নাকি এটা প্রমাণ করে যে নোয়াপাড়ায় “দিদি-অভিষেকের জনপ্রিয়তা” আজ তলানিতে?
যে বিকাশ বসুর স্ত্রীকে একসময় অপমান করা হয়েছে, আজ তাঁর স্বামীর ছবিকে সামনে রেখে ভোট চাইতে হচ্ছে, এই দ্বিচারিতা মানুষ স্পষ্ট দেখছে।
তৃণাঙ্কুর ভট্টাচার্য ২০১৮ সাল থেকে তৃণমূল ছাত্র পরিষদের সভাপতি। কিন্তু সেই ২০১৮ সাল থেকেই ছাত্র নির্বাচন বন্ধ। তাহলে প্রশ্ন ওঠে, গণতন্ত্র কোথায়? ছাত্রদের কণ্ঠরোধ করে নেতৃত্বের দাবি কতটা গ্রহণযোগ্য?
ব্যারাকপুর রাজনীতিতে “শুধু” আর আরবিসি কলেজের আধিপত্যের কথা সকলেই জানেন। তাহলে কি নোয়াপাড়া কলেজও নৈহাটির নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে? ইতিমধ্যেই কলেজ গভর্নিং বডিতে নৈহাটির প্রভাব দেখা যাচ্ছে।
এখানেই শেষ নয়, কানাঘুষো শোনা যাচ্ছে, তৃণাঙ্কুর ভট্টাচার্য নাকি পার্থ ভৌমিকের আত্মীয়। যদি তা সত্যি হয়, তাহলে প্রার্থী নির্বাচনে স্বজনপোষণের অভিযোগ কি অমূলক?
অন্যদিকে বিকাশ বসুর ভাই প্রদীপ বসু, যিনি একসময় কংগ্রেস করতেন, সক্রিয় রাজনীতিতে ছিলেন না, চাকরি জীবন শেষ করে রাজনীতিতে এসেছেন। অথচ আজ তিনিই তৃণাঙ্কুরের চিফ ইলেকশন এজেন্ট।
এটা কি আদর্শের রাজনীতি, না সুবিধাবাদের রাজনীতি?
২০০০ সালে মঞ্জু বসুকে সামনে রেখে নোয়াপাড়ায় রাজনীতি করেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তখন প্রদীপ বসু রাজনীতিতে ছিলেন না।
আজ সবকিছু বদলে গেছে, মানুষও বুঝছে এই পরিবর্তনের কারণ।
আরও একটি বড় প্রশ্ন, যদি তৃণাঙ্কুর জেতেন, তাহলে কি মলয় ঘোষ ও রমেন দাসদের মতো পুরনো নেতৃত্বকে সরিয়ে দেওয়া হবে?
এই আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
অর্জুন সিং নিজেই দাবি করেছেন, বিকাশ বসুর খুনের পেছনে ছিলেন জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক।
এই বক্তব্য যদি সত্যি হয়, তাহলে ২০১৬ সালে মঞ্জু বসুর বিরুদ্ধে মলয় ঘোষকে সামনে এনে “সাবোটাজ” কেন করা হয়েছিল?
তৎকালীন জেলা নেতৃত্ব কি ইচ্ছাকৃতভাবে মঞ্জু বসুকে দুর্বল করতে চেয়েছিল?
২০১৮ সালের উপনির্বাচনে জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক জেলা সভাপতি থাকাকালীন মঞ্জু বসুর টিকিট কাটা হয়।
এটা কি কাকতালীয়?
নাকি পরিকল্পিত রাজনৈতিক চক্রান্ত?
এখন আবার ২১শে এপ্রিল রোড শো এবং ২২শে এপ্রিল জনসভা, এই সব কর্মসূচি দেখে মনে হচ্ছে, তৃণমূল নিজের অবস্থান নিয়ে আত্মবিশ্বাসী নয়।
মানুষের সমর্থন যদি থাকত, তাহলে এত “শো অফ স্ট্রেংথ”-এর প্রয়োজন পড়ত না।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন,
নারী ক্ষমতায়নের কথা মুখে বললেও, বাস্তবে কি সেই সম্মান দেওয়া হচ্ছে?
বিকাশ বসুর স্ত্রী মঞ্জু বসুকে প্রকাশ্যে অপমান করা হয়েছে, এটা শুধু একজন ব্যক্তির অপমান নয়, এটা গোটা নারীত্বের অপমান।
ব্যারাকপুর লোকসভায় একমাত্র মহিলা বিধায়ককে যদি এইভাবে হেয় করা হয়, তাহলে সাধারণ নারীর নিরাপত্তা কোথায়?
জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক দীর্ঘদিন ধরেই মঞ্জু বসুকে সহ্য করতে পারেননি, এমন অভিযোগ বহুবার উঠেছে।
২০১৬ সালে তাঁর অনুগামী মলয় ঘোষকে দিয়ে সাবোটাজ, ২০১৮ সালে টিকিট কাটা, এই ঘটনাগুলো কি শুধুই কাকতালীয়?
সবশেষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন,
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিকাশ বসুর খুনের তদন্ত সঠিকভাবে করালেন না কেন?
তদন্ত হলে কি অনেক অজানা সত্য সামনে চলে আসত?
অনেক বড় নাম কি জড়িয়ে পড়ত?
আজ নোয়াপাড়ার মানুষ সব দেখছে, সব বুঝছে।
তারা জানে- কে সত্যের পাশে, আর কে শুধু ক্ষমতার খেলায় মেতে আছে।
আজ সময় এসেছে, মানুষ নিজের বিচার নিজেই করুক।
শহীদ বিকাশ বসুর আত্মা হয়তো আজও অপেক্ষা করছে,
সত্যের, ন্যায়ের, আর প্রকৃত বিচারের জন্য।
নোয়াপাড়ার মাটি আরেকবার ইতিহাস লিখতে চলেছে।
এইবার সিদ্ধান্ত নেবে সাধারণ মানুষ,
ভোটের মাধ্যমে, বিবেকের মাধ্যমে।
কারণ,
সত্যকে চিরকাল চাপা রাখা যায় না।
- লিখেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নোয়াপাড়ার তৃণমূল কর্মী, এই প্রতিবেদনের কোন দায় kolkata24x7 এর নয়




















