সিলেট: বাংলাদেশ যেন দিনের পর দিন হয়ে উঠছে অরাজকতা এবং জঙ্গিপনার আড্ডাখানা (sylhet)। ধর্মীয় অবমাননার নাম করে সাধারণ মানুষের উপর অত্যাচারের ঘটনা আজকের বাংলাদেশের রোজনামচা। এই আবহেই ফের ইসলামপন্থীরা সিলেট জেলার বিশ্বনাথে ভাংচুর করল বাউল গানের মঞ্চ।
🚨 In Bishwanath Upazila, Sylhet, Islamists stormed a singing program shouting “Allahu Akbar” and vandalized the stage.
They openly threatened that music and singing is “haram” in Islam, so such programs will no longer be allowed in Bangladesh. pic.twitter.com/m07zLnFwyh
— Voice Of BD Hindus 🇧🇩 (@HinduBdeshi71) June 18, 2026
সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার শ্রীপুর গ্রাম। ইব্রাহিম শাহ মাজারের পাশে শতবর্ষী ঐতিহ্যের এক বাউল গানের আসর চলছিল। রাতের আঁধারে মাজার ঘিরে ভক্ত-শ্রোতাদের মিলনমেলা, বাউল শিল্পীদের একতারা-দোতারার সুর আর আধ্যাত্মিক গানের মূর্ছনায় মুখরিত ছিল চারপাশ। কিন্তু হঠাৎই শান্তির সেই পরিবেশ ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। শতাধিক লোকের একটি সংঘবদ্ধ দল চড়াও হয় অনুষ্ঠানস্থলে।
আরও দেখুনঃ ইউনূসের ‘চার্টার’ ঘিরে সংঘাত! তারেক সরকারকে কড়া হুঁশিয়ারি জামায়াতের
তাদের মুখে উচ্চারিত হচ্ছিল ‘নারায়ে তাকবীর, আল্লাহু আকবর’ আর ‘ইসলামের শত্রুরা সাবধান’ এমন স্লোগান। তারা মঞ্চে উঠে বাদ্যযন্ত্র ভাঙচুর করে, সাউন্ড সিস্টেম ছুড়ে ফেলে, চেয়ার-টেবিল তছনছ করে দেয়। শিল্পীরা এবং দর্শকরা আতঙ্কে ছুটোছুটি করতে থাকেন। একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান মুহূর্তে পরিণত হয় ভয়ের রাতে।এ ঘটনা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।
বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় এটি একটি ভয়াবহ নিয়মিত চিত্রের অংশ হয়ে উঠছে। ধর্মের নামে সাধারণ মানুষের উপর অত্যাচার, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে হামলা, সংগীতকে ‘হারাম’ বলে ঘোষণা করে নিষিদ্ধ করার হুমকি এসব এখন দেশের রোজনামচায় পরিণত হয়েছে। বিশ্বনাথের এই হামলাকারীরা স্পষ্টভাবে বলে গেছেন, ইসলামে গান-বাজনা হারাম, তাই বাংলাদেশে আর এ ধরনের কোনো অনুষ্ঠান চলতে দেওয়া হবে না।
তাদের এই উগ্র অবস্থান শুধু বাউল গানকেই নয়, বাংলার সমৃদ্ধ লোকসংস্কৃতি, বাউল-সুফি ঐতিহ্য এবং ধর্মনিরপেক্ষতার মূল স্তম্ভকেই চ্যালেঞ্জ করছে।বাউল গান বাংলাদেশের আত্মার গান। লালন ফকির, হাসন রাজা, রাধারমণের ধারায় বয়ে আসা এই সংগীত কোনো ধর্মীয় বিভেদ সৃষ্টি করে না; বরং মানুষে-মানুষে, আত্মায়-পরমাত্মায় মিলনের কথা বলে। মাজারের পাশে এমন অনুষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে।
ভক্তরা আসেন দূর-দূরান্ত থেকে, শান্তি ও আধ্যাত্মিকতা খুঁজতে। কিন্তু আজকের বাংলাদেশে সেই ঐতিহ্যকে ‘ধর্মের অবমাননা’ বলে চিহ্নিত করা হচ্ছে। একই ধরনের ঘটনা ঘটছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। কোথাও পূজামণ্ডপে হামলা, কোথাও সাধারণ মানুষকে ধর্মীয় অজুহাতে হয়রানি, কোথাও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর চাপ। অরাজকতা ও জঙ্গিপনার আড্ডাখানায় পরিণত হচ্ছে দেশ, এমন অভিযোগ এখন আর শুধু বিরোধীদের কথা নয় সাধারণ মানুষের মনে গেঁথে যাওয়া আশঙ্কা।
স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হামলাকারীরা সংঘবদ্ধ ছিল এবং পরিকল্পিতভাবে এসেছিল। তারা মঞ্চ দখল করে ভাঙচুর চালায় এবং হুমকি দিয়ে চলে যায়। ঘটনার পর দিন কেটে গেলেও এখনও কোনো মামলা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। পুলিশ তদন্ত করছে বললেও আতঙ্কিত শিল্পী ও আয়োজকরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। এ ধরনের ঘটনা বারবার ঘটতে থাকলে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গন শুকিয়ে যাবে।
বাউল শিল্পীরা, যারা গ্রাম-গঞ্জে সাধারণ মানুষের মনের কথা বলেন, তারা কোথায় আশ্রয় নেবেন? সংগীতের আসরগুলো কি একে একে বন্ধ হয়ে যাবে?বাংলাদেশ একসময় ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের জন্য বিখ্যাত ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উগ্রবাদী চিন্তার উত্থান সেই ঐতিহ্যকে ক্রমশ গ্রাস করছে।
ধর্মকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক ও সামাজিক আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা চলছে। যারা গান গায়, যারা সংস্কৃতি চর্চা করে, তাদের ‘ইসলামের শত্রু’ বলে চিহ্নিত করা হচ্ছে। এতে শুধু সংখ্যালঘুরাই নয়, সাধারণ মুসলিম সমাজেরও একটি বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যারা শান্তিপূর্ণভাবে ধর্ম পালনের পাশাপাশি সংস্কৃতিকে ভালোবাসেন।


