ঢাকা: জাতীয় নির্বাচনের ঠিক তিন দিন আগে, আগামী ৯ ফেব্রুয়ারি, আমেরিকার সঙ্গে একটি বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করতে চলেছে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। কিন্তু এই চুক্তির শর্ত বা বিষয়বস্তু সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও তথ্য প্রকাশ না করায় দেশের রফতানিকারী, অর্থনীতিবিদ এবং রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে।
ড. মহম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন এই অনির্বাচিত প্রশাসন কোনও প্রকার জনমত বা সংসদীয় যাচাই-বাছাই ছাড়াই একটি দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতিতে দেশকে আবদ্ধ করার চেষ্টা করছে বলে সমালোচকরা অভিযোগ করেছেন।
এনডিএ (NDA) স্বাক্ষর, তথ্যের অধিকার কি রুদ্ধ?
সূত্রমতে, ইউনূস প্রশাসন ইতোমধ্যেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটি ‘নন-ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট’ বা গোপনীয়তার চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এর ফলে আলোচনার খুঁটিনাটি জনসাধারণের সামনে আসার পথ বন্ধ হয়ে গিয়েছে। নির্বাচনের ঠিক আগে, যখন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা হস্তান্তর করতে যাচ্ছে, তখন এই ধরনের গোপন চুক্তির বৈধতা ও দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব নিয়ে তীব্র প্রশ্ন তুলেছে।
বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন, তাড়াহুড়ো কেন? Bangladesh-US trade deal
এই তাড়াহুড়োকে “অস্বচ্ছ, অযৌক্তিক ও অনিয়মিত” বলে অভিহিত করেছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও জনবুদ্ধিজীবী আনু মুহাম্মদ। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন তুলেছেন, নির্বাচনের মাত্র কয়েক দিন আগে কেন বন্দর লিজ দেওয়া, অস্ত্র আমদানি এবং আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির মতো বড় সিদ্ধান্তগুলো দ্রুত সম্পন্ন করা হচ্ছে? তাঁর অভিযোগ, প্রশাসনকে প্রভাবিত করে চুক্তির শর্তগুলো চাপিয়ে দিতে বিদেশি লবিস্টরা সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন।
রফতানি খাতে গভীর উদ্বেগ
চুক্তির সবচেয়ে শক্তিশালী বিরোধিতা আসছে বাংলাদেশের রফতানি খাত থেকে, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প (RMG) থেকে, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্যের প্রধান অংশ। বাংলাদেশ প্রতি বছর প্রায় ৭ থেকে ৮.৪ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করে যুক্তরাষ্ট্রে, যার মধ্যে ৯৬ শতাংশই তৈরি পোশাক।
রফতানিকারকরা ভয় পাচ্ছেন যে, গোপন এই চুক্তি তাদের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়ানোর পরিবর্তে উল্টো কমিয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে, ভারত সম্প্রতি আমেরিকার সঙ্গে চুক্তি করে শুল্ক ১৮ শতাংশে নামিয়ে এনেছে, যেখানে বাংলাদেশ বর্তমানে ২০ শতাংশ শুল্কের মুখোমুখি।
বিজিএমইএ-এর সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ইনামুল হক খান বলেন, “পরামর্শের অভাব উদ্বেগজনক। এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি নির্বাচন শেষ হওয়ার পর হওয়া উচিত ছিল।”
নতুন সরকারের ওপর বোঝা?
অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাদের এই পদক্ষেপের মাধ্যমে পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের নীতি নির্ধারণের স্থানকে সংকুচিত করে ফেলছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের বিশিষ্ট ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, নির্বাচনের পরে চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হলে রাজনৈতিক দলগুলোর গুণাগুণ নিয়ে বিতর্ক করার সুযোগ পেত। এখনকার এই তাড়াহুড়ো নতুন প্রশাসনের হাত বেঁধে ফেলার ঝুঁকি তৈরি করছে।
ঢাকা চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (DCCI)-এর সভাপতি তাসকিন আহমেদ বলেন, “চুক্তির খসড়া অজানা থাকায় কে লাভবান হবে বা কার ক্ষতি হবে, তা মূল্যায়ন করা অসম্ভব।”
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
এই বিতর্কটি ড. ইউনূসের প্রশাসন ক্ষমতা গ্রহণের প্রেক্ষাপটকেও পুনরায় সামনে নিয়ে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, ইউনূস প্রশাসন জামায়াতে ইসলামীর মতো গোষ্ঠী এবং পশ্চিমা শক্তির সমর্থনের জোরে ক্ষমতায় এসেছে, যদিও এর কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ নেই।




















