দেশের ক্রীড়া (Khelo India) ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে বড় সিদ্ধান্ত নিল কেন্দ্রীয় সরকার। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সভাপতিত্বে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা ২০২৬-২৭ থেকে ২০৩০-৩১ অর্থবর্ষ পর্যন্ত পাঁচ বছরের জন্য পুনর্গঠিত ‘খেলো ইন্ডিয়া’ প্রকল্প এবং জাতীয় ক্রীড়া ফেডারেশনগুলির (এনএসএফ) আর্থিক সহায়তা প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে। এই দুই প্রকল্পে মোট ৩৬,৪৪১ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। সরকারের মতে, স্বাধীনতার পর ক্রীড়াক্ষেত্রে এটি অন্যতম বৃহত্তম সরকারি বিনিয়োগ, যার লক্ষ্য তৃণমূল স্তর থেকে আন্তর্জাতিক মঞ্চ পর্যন্ত ভারতীয় ক্রীড়াকে আরও শক্তিশালী করে তোলা।
নতুন প্রকল্পে আগের ‘খেলো ইন্ডিয়া’-র তুলনায় প্রায় আট গুণ বেশি অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে। কেন্দ্রের দাবি, দেশের কোনও প্রতিভাবান খেলোয়াড় যাতে সুযোগের অভাবে হারিয়ে না যায়, সেটাই এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য। প্রত্যন্ত গ্রামের মাঠ, স্কুল, কলেজ এবং জেলা স্তর থেকে প্রতিভাবান ক্রীড়াবিদদের চিহ্নিত করে তাঁদের দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ, আধুনিক সুযোগ-সুবিধা এবং আন্তর্জাতিক মানের কোচিং দেওয়া হবে।
সরকার জানিয়েছে, খেলাধুলাকে শুধু প্রতিযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হবে না। শিক্ষা, শারীরিক সক্ষমতা, প্রযুক্তি এবং বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত করে একটি পূর্ণাঙ্গ ক্রীড়া পরিবেশ গড়ে তোলা হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে অলিম্পিক, প্যারালিম্পিক এবং কমনওয়েলথ গেমসের মতো বড় প্রতিযোগিতায় ভারতের সাফল্য বাড়ানোর লক্ষ্যও রয়েছে।
এই প্রকল্পের আওতায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ন্যাশনাল সেন্টারস অব এক্সেলেন্স (এনসিওই), খেলো ইন্ডিয়া সেন্টারস অব এক্সেলেন্স, স্পোর্টস অথরিটি অব ইন্ডিয়ার ট্রেনিং সেন্টার, খেলো ইন্ডিয়া অ্যাক্রেডিটেড অ্যাকাডেমি এবং খেলো ইন্ডিয়া সেন্টার-এর মতো প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলিকে আরও শক্তিশালী করা হবে। সেখানে বিশ্বমানের কোচিং, আধুনিক ক্রীড়াবিজ্ঞান, ফিটনেস সাপোর্ট এবং উন্নত পরিকাঠামোর সুবিধা দেওয়া হবে।
স্কুল পর্যায়েও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নতুন করে চালু করা হবে ‘খেলো ইন্ডিয়া ফিডার স্কুলস’ এবং ‘খেলো ইন্ডিয়া উৎকর্ষ বিদ্যালয়’। এর মাধ্যমে পড়াশোনার পাশাপাশি ছোটবেলা থেকেই প্রতিভাবান ছাত্রছাত্রীদের খুঁজে বের করে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলার ব্যবস্থা করা হবে। সরকারের মতে, ভবিষ্যতের চ্যাম্পিয়ন তৈরির কাজ শুরু হবে স্কুল থেকেই।
এই প্রকল্পের অন্যতম বড় পরিবর্তন হল ‘এমার্জিং খেলো ইন্ডিয়া অ্যাথলিটস’ নামে নতুন বিভাগ চালু করা। এর ফলে বর্তমানের তুলনায় প্রায় দশ গুণ বেশি ক্রীড়াবিদ সরকারি সহায়তার আওতায় আসবেন। তাঁরা নিয়মিত প্রশিক্ষণ, বৈজ্ঞানিক সহায়তা, পুষ্টিবিদ, ফিজিওথেরাপিস্ট এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সুবিধা পাবেন। পাশাপাশি ট্যালেন্ট স্কাউট, জোনাল কমিটি এবং হাই পারফরম্যান্স ম্যানেজারদের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিভা খুঁজে বের করার কাজ আরও জোরদার করা হবে।
কেন্দ্র আরও জানিয়েছে, প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের জন্য তৃণমূল স্তর থেকে টার্গেট অলিম্পিক পোডিয়াম স্কিম (টপস) পর্যন্ত একটি নির্দিষ্ট উন্নয়নের পথ তৈরি করা হবে। এর ফলে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার আগে থেকেই খেলোয়াড়রা উন্নত প্রশিক্ষণ, বিদেশে অনুশীলন এবং বিশ্বমানের প্রস্তুতির সুযোগ পাবেন।
নিয়মিত প্রতিযোগিতার উপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, জেলা, রাজ্য এবং জাতীয় স্তরের প্রতিযোগিতার সংখ্যা বাড়ানো হবে। পাশাপাশি মহিলা ক্রীড়াবিদ, প্যারা অ্যাথলিট এবং দেশীয় খেলাধুলার উন্নয়নের জন্য বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বড় ক্রীড়া প্রতিযোগিতা আয়োজনেও সহায়তা করবে কেন্দ্র।
ফিট ইন্ডিয়া আন্দোলনকেও আরও বিস্তৃত করা হবে। যুব সমাজের মধ্যে শরীরচর্চা, সুস্থ জীবনযাপন এবং নিয়মিত খেলাধুলার অভ্যাস গড়ে তুলতে বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হবে। সীমান্ত এবং দুর্গম এলাকায় খেলাধুলার প্রসার, মহিলাদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং মাদকবিরোধী সচেতনতা গড়ে তুলতেও খেলাধুলাকে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করার পরিকল্পনা রয়েছে।
কোচদের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য গঠন করা হবে ন্যাশনাল কোচ অ্যাক্রেডিটেশন বোর্ড (এনসিএবি)। একই সঙ্গে একটি আধুনিক ডিজিটাল স্পোর্টস প্ল্যাটফর্ম তৈরি হবে, যেখানে ক্রীড়াবিদ, কোচ, প্রতিযোগিতা, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, অর্থ বরাদ্দ এবং বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের তথ্য এক জায়গায় থাকবে। এর ফলে ক্রীড়া প্রশাসনে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং পরিকল্পনা গ্রহণ আরও সহজ হবে।
এ ছাড়া জাতীয় ক্রীড়া ফেডারেশনগুলির জন্য আর্থিক সহায়তাও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ, বিদেশে প্রশিক্ষণ শিবির, আধুনিক সরঞ্জাম, বিদেশি কোচ নিয়োগ এবং ক্রীড়াবিজ্ঞানভিত্তিক প্রস্তুতির জন্য এই অর্থ ব্যবহার করা হবে।
সরকারের বিশ্বাস, এই প্রকল্প শুধু ক্রীড়াক্ষেত্রের উন্নয়নই নয়, আগামী দিনে ভারতকে বিশ্ব ক্রীড়াশক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে বড় ভূমিকা নেবে। পাশাপাশি ‘বিকশিত ভারত ২০৪৭’-এর লক্ষ্য পূরণেও খেলাধুলা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে।





