কলকাতা: বন্ধ্যাত্বের সমস্যা আর শুধু বেশি বয়সী দম্পতিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। কলকাতায় (Kolkata) এখন IVF (In Vitro Fertilization) বা সহায়ক প্রজনন চিকিৎসার জন্য আসা দম্পতিদের প্রায় ১৫ শতাংশের বয়স ৩০ বছরেরও কম। এই উদ্বেগজনক তথ্য তুলে ধরেছেন শহরের একাধিক প্রজনন বিশেষজ্ঞ।
চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ, ৩২ থেকে ৪০ বছর বয়সি কর্মজীবী দম্পতিদের মধ্যেও প্রথমবার বন্ধ্যাত্ব সংক্রান্ত পরামর্শ নেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। তবে অনেকেই কয়েক বছর ধরে স্বাভাবিকভাবে সন্তান ধারণের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর চিকিৎসকের কাছে আসছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, ততদিনে নারীদের ডিম্বাণুর সংখ্যা ও গুণগত মান কমে যেতে পারে, ফলে চিকিৎসায় সফলতার সম্ভাবনাও হ্রাস পায়।
অভা সার্জি সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রজনন বিশেষজ্ঞ ডা. বাণী কুমার মিত্র সংবাদমাধ্যমের কাছে বলেন, তরুণ-তরুণীদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার অংশ হিসেবেই এখন থেকে ফার্টিলিটি কাউন্সেলিং, ওভারিয়ান রিজার্ভ মূল্যায়ন এবং ভবিষ্যৎ পরিবার পরিকল্পনা নিয়ে পরামর্শ অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বন্ধ্যাত্বের অন্যতম বড় সমস্যা হল এর অনেক ক্ষেত্রেই স্পষ্ট কোনও লক্ষণ থাকে না। অনেক দম্পতি বুঝতেই পারেন না যে তাঁদের প্রজনন সংক্রান্ত সমস্যা রয়েছে। তবে অনিয়মিত বা দীর্ঘদিন মাসিক না হওয়া, অতিরিক্ত মাসিকের ব্যথা, এন্ডোমেট্রিওসিস, পেলভিক সংক্রমণের ইতিহাস বা পুরুষদের অণ্ডকোষজনিত সমস্যা থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
বিড়লা ফার্টিলিটি অ্যান্ড IVF-এর বিশেষজ্ঞ ডা. স্বাতী মিশ্র সংবাদমাধ্যমকে জানান, ৩৫ বছরের কম বয়সি নারীদের ক্ষেত্রে এক বছর নিয়মিত চেষ্টা করেও গর্ভধারণ না হলে পরীক্ষা করানো উচিত। আর ৩৫ বছরের বেশি হলে সাধারণত ছয় মাস চেষ্টা ব্যর্থ হলেই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়।
তিনি আরও বলেন, বন্ধ্যাত্বের মূল্যায়ন মানেই যে IVF করতে হবে, এমন নয়। প্রথমে দম্পতির চিকিৎসার ইতিহাস, মাসিক চক্র, ডিম্বস্ফোটন, ওভারিয়ান রিজার্ভ, জরায়ু ও ফ্যালোপিয়ান টিউবের অবস্থা এবং পুরুষের বীর্য পরীক্ষা করা হয়। সমস্যার ধরন অনুযায়ী জীবনযাত্রায় পরিবর্তন, ওষুধ, IUI, IVF, ICSI বা অন্যান্য চিকিৎসা বেছে নেওয়া হয়।
চিকিৎসকদের দাবি, বর্তমানে বন্ধ্যাত্বের ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ ক্ষেত্রে পুরুষদের শারীরিক সমস্যাও গুরুত্বপূর্ণ কারণ হয়ে উঠছে। চার্নক হাসপাতালের স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. দিব্যেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় সংবাদমাধ্যমকে বলেন, মানসিক চাপ, উচ্চ রক্তচাপ, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, ধূমপান, ডায়াবেটিস এবং হাইপোথাইরয়েডিজম পুরুষদের প্রজনন ক্ষমতার উপর বড় প্রভাব ফেলছে। তবুও সমাজে এখনও সন্তান না হলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নারীদের দায়ী করা হয়। তিনি বলেন, কোনও দম্পতি যদি এক বছর চেষ্টা করেও সন্তান ধারণে সফল না হন, তাহলে পুরুষদেরও অবশ্যই স্পার্ম কাউন্ট পরীক্ষা করানো উচিত।
বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে মোট প্রজনন হার (Total Fertility Rate বা TFR) বর্তমানে ১.৬, যা জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখতে প্রয়োজনীয় ২.১-এর তুলনায় অনেক কম। একই সঙ্গে গত ১০ বছরে কলকাতায় পুরুষদের বন্ধ্যাত্বের সমস্যা প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে বলেও চিকিৎসকদের দাবি।
চিকিৎসকদের মতে, বর্তমানে কম বয়সী নারীদের মধ্যেও পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (PCOS), এন্ডোমেট্রিওসিস, থাইরয়েডের সমস্যা, অনিয়মিত মাসিক এবং কম AMH (Anti-Müllerian Hormone)-এর মতো সমস্যা বাড়ছে। এগুলি ডিম্বাণুর মজুত কমে যাওয়ার ইঙ্গিত দিতে পারে এবং ভবিষ্যতে গর্ভধারণে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কর্মজীবন, আর্থিক পরিকল্পনা এবং ব্যক্তিগত লক্ষ্যকে অগ্রাধিকার দিয়ে অনেকেই এখন দেরিতে সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। যদিও এটি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশেষ করে ৩৫ বছরের পর নারীদের প্রজনন ক্ষমতা স্বাভাবিকভাবেই কমতে শুরু করে। এর পাশাপাশি স্থূলতা, ধূমপান, অতিরিক্ত মদ্যপান, পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব এবং কিছু দীর্ঘস্থায়ী রোগও নারী ও পুরুষ উভয়ের প্রজনন ক্ষমতার উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে সতর্ক করেছেন চিকিৎসকরা।
Also Read | সন্ত্রাসবাদ অর্থায়নে ফের নজরে বাংলা! কালিকাপুরের মাদ্রাসা থেকে উদ্ধার ৪০লক্ষ নগদ-১৮০ গ্রামের সোনার মুদ্রা
Also Read | পরের স্টেশন মোহনবাগান! মাঠের গণ্ডি ছাড়িয়ে মেট্রোর মানচিত্রে শতাব্দীপ্রাচীন ক্লাব
Also Read | কংগ্রেসের কারণে কলকাতা ছাড়েন তসলিমা! বিস্ফোরক তৎকালীন শরিক সিপিএম নেতা
Also Read | IRCTC-এর ৯ দিনের তীর্থযাত্রা ট্রেন: জ্যোতির্লিঙ্গ থেকে দ্বারকা-অক্ষরধাম, ভাড়া ও রুট জানুন
Also Read | মিরিক লেককে আরও সুন্দর করতে ১০০কোটির পর্যটন প্রকল্প শুভেন্দু সরকারের





