কলকাতা: কোভিড-১৯ মহামারির সময় বহু পরিবারের জীবনে (Migrant Workers ) এক মুহূর্তে নেমে এসেছিল অনিশ্চয়তা। কাজ হারানো, আয় বন্ধ হয়ে যাওয়া, চিকিৎসার অভাব এবং খাদ্য সংকট, এই সবকিছুর মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল, “আয় বন্ধ হয়ে গেলে মানুষ ভরসা করবে কার ওপর?”
২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৩ সালের মার্চের মধ্যে পরিচালিত একটি গবেষণায় উঠে এসেছে, কোভিড-১৯ নতুন করে সব সমস্যা তৈরি করেনি। বরং সমাজে আগে থেকেই থাকা অর্থনৈতিক ও সামাজিক দুর্বলতাগুলিকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছিল। অনেক ক্ষেত্রে সেই সংকট এতটাই গভীর হয়েছিল যে, পরিবারগুলিকে এমন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল, যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব তাদের জীবন ও ভবিষ্যতের উপর পড়েছে।
Also Read | ভারতের কল্পক্কমে চালু বিশ্বের প্রথম নিউক্লিয়ার তাপ-ভিত্তিক হাইড্রোজেন উৎপাদন কেন্দ্র
প্রথমে কমেছে খাবারের পরিমাণ, পরে শুরু কঠিন সিদ্ধান্ত
গবেষণায় মূল গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে খাদ্য নিরাপত্তা (Food Insecurity)-র ওপর। অর্থাৎ, একটি পরিবার পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাবার সংগ্রহ করতে পারছে কি না, সেই বিষয়টি বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
আয় কমে যাওয়ার পর প্রথম দিকে অনেক পরিবার খাবারের পরিমাণ কমিয়ে দেয়। দুধ, ডিম, মাছ, মাংসের মতো তুলনামূলক দামি খাবার কেনা বন্ধ করে দেয়। এতে কোনওভাবে দৈনন্দিন খরচ সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলতে থাকে।
কিন্তু লকডাউন দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সঞ্চয় শেষ হয়ে যায়। তখন অনেক পরিবারকে খাদ্য কেনার জন্য ঋণ নিতে হয়। কেউ চিকিৎসা পিছিয়ে দেন, আবার কেউ সাময়িকভাবে সন্তানদের স্কুল থেকেও সরিয়ে নিতে বাধ্য হন।
গবেষকদের মতে, এগুলি আর সাময়িক সমাধান ছিল না। এগুলি ভবিষ্যতের উপর দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
মায়েরা না খেয়ে থেকেছেন, যাতে সন্তান খেতে পারে
গবেষণায় উঠে এসেছে একাধিক হৃদয়বিদারক অভিজ্ঞতা। বহু পরিবারে মায়েরা নিজের খাবার কমিয়ে দিয়েছেন বা একেবারেই খাননি, যাতে সন্তানদের খাবার জোগানো যায়। পরিবারের পুরুষ সদস্যরা কাজের সন্ধানে বেরোতে পারেন, সেই কারণেও তাঁদের জন্য খাবার বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে।
কিছু পরিবারে শিশুদের অস্থায়ীভাবে আত্মীয়দের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়, যাতে পরিবারের খরচ কিছুটা কমানো যায়। আবার বহু পরিযায়ী শ্রমিক কাজ হারিয়ে শহর ছেড়ে নিজের গ্রামে ফিরে যেতে বাধ্য হন।
Also Read | ‘জ্বালানি সংকটে একটা পেট্রল পাম্প ও বন্ধ হতে দিইনি!’ বার্তা মোদীর
গ্রামে ফিরেও মিলেনি নিশ্চিন্ত জীবন
কোভিডের সময় লক্ষ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিক শহর থেকে গ্রামে ফিরে গিয়েছিলেন। অনেকের ধারণা ছিল, গ্রামে অন্তত খাবারের অভাব হবে না। কিন্তু উত্তরপ্রদেশ ও গোয়ার কিছু এলাকায় পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, এই উল্টো অভিবাসন (Reverse Migration) গ্রামীণ অর্থনীতির উপরও নতুন চাপ তৈরি করে।
গ্রামে কাজের সুযোগ সীমিত থাকায় অনেকেই আগে শহরে গিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। হঠাৎ বিপুল সংখ্যক মানুষ ফিরে আসায় সেই সীমিত কাজও আরও কমে যায়।
একটি ক্ষেত্রে দেখা যায়, জমির মালিক নিজের ছেলেরা গ্রামে ফিরে আসার পর ভাগচাষ (বাটাই) ব্যবস্থা বন্ধ করে দেন। ফলে ভূমিহীন শ্রমিকরা শুধু কাজই হারাননি, বছরের জন্য যে শস্য পাওয়ার কথা ছিল, সেটিও হারিয়েছেন।
সরকারি রেশন বহু পরিবারের লাইফলাইন হয়েছিল
কোভিডের সময় পাবলিক ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম (PDS) বা সরকারি রেশন ব্যবস্থা বহু পরিবারের জন্য সবচেয়ে বড় ভরসা হয়ে ওঠে। সরকার রেশনে চাল ও গমের বরাদ্দ বাড়ায়। কিছু এলাকায় তেল ও ছোলার মতো খাদ্যসামগ্রীও দেওয়া হয়, যাতে খাদ্যতালিকায় কিছুটা বৈচিত্র্য আসে।
অনেক পরিবার জানিয়েছেন, লকডাউনের সময় তাঁরা শুধু রেশনের চাল-গম এবং লবণ খেয়েই দিন কাটিয়েছেন। যেসব কৃষক পরিবার নিজেরা সবজি বা ডাল উৎপাদন করতেন, তাঁদেরও বাজারে বিক্রির সুযোগ কমে যাওয়ায় সমস্যায় পড়তে হয়।
Also Read | চিন-পাকিস্তানকে পর্যুদস্ত করতে প্রতিরক্ষায় আরও ৫২,০০০ কোটি রাজনাথের
পরিযায়ী শ্রমিকদের সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল নথিপত্র
গবেষণায় বলা হয়েছে, সরকারি সহায়তা অনেক ক্ষেত্রেই কার্যকর ছিল। কিন্তু পরিযায়ী শ্রমিকদের বড় অংশ সেই সুবিধা পাননি। কারণ, তাঁদের অনেকের স্থানীয় রেশন কার্ড বা প্রয়োজনীয় নথি ছিল না। ফলে তাঁরা সরকারি খাদ্য সহায়তার বাইরে থেকে যান। অনেককে বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা, পরিচিত মানুষ বা ঋণের উপর নির্ভর করতে হয়েছে।
ভবিষ্যতের জন্য কী পরামর্শ দিচ্ছেন গবেষকরা?
গবেষকদের মতে, ভবিষ্যতে মহামারি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সংঘাত বা বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার সমস্যার মতো সংকট আরও দেখা দিতে পারে। তাই এখন থেকেই সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
তাঁদের মতে, ‘ওয়ান নেশন, ওয়ান রেশন কার্ড (ONORC)’ প্রকল্প পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হলেও এখনও সচেতনতার অভাব এবং বাস্তবায়নে নানা সমস্যা রয়েছে।
গবেষণার সুপারিশ, একটি পরিবারের সদস্যরা যদি দেশের বিভিন্ন জায়গায় বসবাস করেন, তাহলে তাঁদের বর্তমান বাসস্থানের ভিত্তিতে রেশন পাওয়ার ব্যবস্থা আরও সহজ করা উচিত। পাশাপাশি সরকারি খাদ্য নিরাপত্তা প্রকল্পগুলিকে এমনভাবে শক্তিশালী করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতের কোনও সংকট সাময়িক খাদ্য সমস্যাকে দীর্ঘমেয়াদি দারিদ্র্য ও বৈষম্যে পরিণত না করে।


