কোথায় শেষ দেশের গণ্ডি? কারা যেতে পারেন সীমান্তের ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’-এ?

কলকাতা: দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার আন্তর্জাতিক স্থল সীমান্তটি এক অনন্য এবং অত্যন্ত জটিল মানচিত্র বহন করছে। দেশভাগের ঐতিহাসিক বিভাজন রেখা, পাহাড়ি নদী,…

no mans land in india bangladesh border

কলকাতা: দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার আন্তর্জাতিক স্থল সীমান্তটি এক অনন্য এবং অত্যন্ত জটিল মানচিত্র বহন করছে। দেশভাগের ঐতিহাসিক বিভাজন রেখা, পাহাড়ি নদী, গহীন অরণ্য এবং ঘন জনবসতির বুক চিরে চলে যাওয়া এই সীমান্তটি দুই দেশের নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক ক্ষেত্রে অত্যন্ত সংবেদনশীল। সীমান্ত নিয়ে সাধারণ মানুষের কৌতূহলের অন্ত নেই, যার মধ্যে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ও বিভ্রান্তির জায়গা হলো ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’ বা ‘অনাগত ভূমি’। এই অঞ্চলটি আসলে কার, সেখানে কার আইন চলে, কিংবা সেখানে কি সাধারণ মানুষের যাওয়ার অনুমতি রয়েছে? এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে রয়েছে দুই দেশের সীমান্ত চুক্তি ও ভৌগোলিক বিন্যাসের মধ্যে।

ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের (MHA) সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের মোট ৪,০৯৬.৭ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি স্থল সীমান্ত রয়েছে, যা যেকোনো প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘতম আন্তর্জাতিক স্থলসীমা। ভারতের মোট পাঁচটি রাজ্য বাংলাদেশের সঙ্গে এই সীমানা ভাগ করে নিয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘতম সীমান্ত রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের সাথে, যার দৈর্ঘ্য ২,২১৬.৭ কিলোমিটার এবং এই অঞ্চলের বড় অংশই নদীমাতৃক। এর পরেই রয়েছে ত্রিপুরা রাজ্য, যা তিন দিক থেকেই বাংলাদেশ দ্বারা পরিবেষ্টিত এবং এর সীমান্তের দৈর্ঘ্য ৮৫৬ কিলোমিটার। এছাড়া পাহাড়ি ও ঘন জঙ্গলময় এলাকা নিয়ে মেঘালয়ের সীমান্ত ৪৪৩ কিলোমিটার, সুদূর উত্তর-পূর্বের অত্যন্ত দুর্গম ও পাহাড়ি অঞ্চল নিয়ে মিজোরামের সীমান্ত ৩১৮ কিলোমিটার এবং নদী ও চা-বাগান ঘেরা অসমের সীমান্ত ২৬৩ কিলোমিটার।

Advertisements

এই সুদীর্ঘ সীমান্তের সুরক্ষায় বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (BSF) দিনরাত নিয়োজিত রয়েছে। ইতিমধ্যে সীমান্তের প্রায় ৩,২৩২ কিলোমিটার অংশ কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে সুরক্ষিত করা সম্ভব হয়েছে। তবে নদী, জলাভূমি এবং দুর্গম পাহাড়ের কারণে প্রায় ৮৬৪ কিলোমিটার এলাকায় প্রচলিত বেড়া দেওয়া কার্যত অসম্ভব রয়ে গিয়েছে। এই নদীমাতৃক ও পাহাড়ি এলাকাগুলোতে বিএসএফ এখন আধুনিক প্রযুক্তি ও ইলেকট্রনিক নজরদারির (যেমন থার্মাল ক্যামেরা, সেন্সর ও ড্রোন) মাধ্যমে কড়া পাহারা নিশ্চিত করে।

সীমান্তের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’ হলো মূলত দুটি দেশের মূল সীমানা রেখার (জিরো লাইন) দুই পাশে থাকা একটি নির্দিষ্ট বাফার জোন। ১৯৭৫ সালে স্বাক্ষরিত ‘যৌথ ভারত-বাংলাদেশ নির্দেশিকা’ (Joint India-Bangladesh Guidelines) চুক্তির নিয়ম অনুসারে, মূল জিরো লাইন থেকে দুই দেশের ভেতরের দিকে ১৫০ গজ বা প্রায় ৪৫০ ফুট দূরত্বের মধ্যে ভারত বা বাংলাদেশ, কোনও পক্ষই স্থায়ী বা অস্থায়ী কোনও ধরনের পরিকাঠামো নির্মাণ করতে পারে না। এই সীমানার মধ্যে কোনো বসতবাড়ি, বাণিজ্যিক ভবন, সামরিক বাঙ্কার বা স্থায়ী চৌকি তৈরি করার ওপর আন্তর্জাতিক কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এই ১৫০ গজের এলাকাটিকেই মূলত ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’ বলা হয়, যা সীমান্ত সুরক্ষায় এবং দুই দেশের সার্বভৌমত্ব বজায় রাখতে এক নিরপেক্ষ অঞ্চল হিসেবে কাজ করে।