কলকাতা: ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে সবচেয়ে বড় অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির (BJP) কাছে শোচনীয় পরাজয় এবং দলের অন্দরে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে শুরু হওয়া নজিরবিহীন খোলাখুলি বিদ্রোহে যখন তৃণমূলের ভিত কাঁপছে, ঠিক তখনই এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এসেছে দলের অন্যতম বড় চালিকাশক্তি তথা গ্ল্যামারাস ‘টলিউড ব্রিগেড’-এর মধ্যে।
গত ৪ মে নির্বাচনী ফলাফলে তৃণমূলের চরম বিপর্যয়ের পর থেকেই কার্যত নিখোঁজ শাসক দলের একঝাঁক তারকা অভিনেতা, পরিচালক ও গায়ক। বিগত নির্বাচনগুলিতে যাঁরা চড়া সুরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষে সওয়াল করতেন, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই ‘মহাবিদ্রোহের’ আবহে তাঁরা এখন সম্পূর্ণ মুখে কুলুপ এঁটেছেন। এমনকি দলের সবচেয়ে স্পষ্টবক্তা হিসেবে পরিচিত যাদবপুরের সাংসদ সায়নী ঘোষও এই বিদ্রোহ নিয়ে একটি শব্দও খরচ করেননি। তারকাদের পাশাপাশি মহুয়া মৈত্রের মতো হেভিওয়েট সাংসদকেও এই বিদ্রোহ নিয়ে কোনও মন্তব্য করতে দেখা যায়নি।
বিজেপি ঝড়ে খড়কুটোর মতো উড়লেন তারকারা
৪ মে-র নির্বাচনী ফলাফল তৃণমূলের তারকা প্রার্থীদের জন্য ছিল অত্যন্ত নির্মম। গেরুয়া ঝড়ে খড়কুটোর মতো উড়ে গিয়েছেন রাজ চক্রবর্তী ও সোহম চক্রবর্তীর মতো নামী পরিচালক ও অভিনেতারা। একই রকম হারের মুখ দেখতে হয়েছে সায়ন্তিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, লাভলি মৈত্র এবং শ্রেয়া পাণ্ডেকেও। শুধু রূপোলি পর্দার জগৎই নয়, তৃণমূলের সংস্কৃতি জগতের হেভিওয়েট মুখ যেমন গায়ক ইন্দ্রনীল সেন, অদিতি মুন্সি এবং বীরবাহা হাঁসদা ও অর্পিতা ঘোষের মতো পরিচিত মুখগুলিও এই নির্বাচনে পরাস্ত হয়েছেন।
দল ছাড়ার হিড়িক ও দূরত্ব তৈরি
অনেকেই এখন পরাজয়ের পর তৃণমূলের থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে শুরু করেছেন। ৫ মে প্রাক্তন ক্রিকেটার মনোজ তিওয়ারি, যিনি নিজে বিজেপি প্রার্থী পাপিয়া অধিকারীর কাছে পরাজিত হয়েছেন, তিনি তৃণমূল ছাড়ার ঘোষণা করেন। দল ছাড়ার পাশাপাশি বিদায়ী ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিয়ে মনোজ বলেন, “অরূপদা কোনও খেলার ‘এ-বি-সি-ডি’ জানেন না”। ডুরান্ড কাপের মতো বড় টুর্নামেন্টের পর বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাঁকে কীভাবে মঞ্চ থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছিল এবং অবহেলা করা হয়েছিল, সেই বিস্ফোরক অভিযোগও আনেন তিনি।
অন্য দিকে, দলের তারকা সাংসদ দেব অধিকারী, যিনি ২০২৪ সাল থেকেই দল ছাড়ার ভাবনায় ছিলেন বলে খবর, তিনি গত ৬ মে চমৎকার জয়ের জন্য বিজেপি-কে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। ঠিক সেই সময়েই তৃণমূল শীর্ষ নেতৃত্ব যখন ভোটের ফল ‘চুরি’ যাওয়ার অভিযোগ তুলছিল এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ইস্তফা না দেওয়ার জেদ ধরেছিলেন, দেবের এই শুভেচ্ছা বার্তা দল থেকে তাঁর মানসিক দূরত্বকেই স্পষ্ট করে দেয়।
আদর্শহীনতার ফাটল
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দুর্নীতি এবং দমন-পীড়নের রাজনীতির বিরুদ্ধে বাংলার মানুষের যে ক্ষোভ রাস্তায় আছড়ে পড়ছে, তা দেখেই সেলিব্রিটিরা নিজেদের কেরিয়ার বাঁচাতে পিছু হটছেন। এর অন্যতম বড় কারণ হলো, টলিউডের এই ব্রিগেডের সাথে তৃণমূলের কোনও আদর্শগত মিল বা বাঁধন কখনও ছিল না। একটা সময় যে তারকারা দলের প্রবীণ ও নির্বাচিত জনপ্রতিধিদের উপেক্ষা করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে মঞ্চ আলো করে থাকতেন, আজ এই ঘোর সংকটের দিনে নেত্রীর পাশে সেই গ্ল্যামারাস মুখগুলোও নেই, আবার দলে বিধায়ক-সাংসদদের সমর্থনও নেই।




















