টলিউডে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। বুধবার দুপুরে আচমকাই ছড়িয়ে পড়ে এক উদ্বেগজনক খবর গড়িয়াহাট এলাকার একটি আবাসনের ছাদ থেকে পড়ে গুরুতর আহত হয়েছেন বিশিষ্ট পরিচালক অনীক দত্ত (Anik Dutta)। ঘটনাকে ঘিরে মুহূর্তের মধ্যেই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে বাংলা চলচ্চিত্র মহলে। প্রাথমিকভাবে তাঁকে দ্রুত উদ্ধার করে ঢাকুরিয়ার একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় বলে জানা যায়। চিকিৎসকরা তখনই তাঁর অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানান।
কিন্তু পরিস্থিতি আরও জটিল মোড় নেয় কিছুক্ষণের মধ্যেই। হাসপাতাল সূত্রে খবর ছড়িয়ে পড়ে, পরিচালক আর বেঁচে নেই। যদিও এই খবরের সত্যতা নিয়ে শুরু থেকেই ধোঁয়াশা তৈরি হয়। টলিপাড়ায় একদিকে যখন শোকের পরিবেশ, অন্যদিকে তখনই শুরু হয় বিভ্রান্তি ও অনিশ্চয়তা। পরিবার বা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তরফে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু না জানানোয় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। ইতিমধ্যেই ওঁর বাড়িতে পৌঁছোয় পুলিশ। কী ভাবে এই দুর্ঘটনা ঘটল তা নিয়ে পুলিশের তরফে কোনও বিবৃতি দেওয়া হয়নি। তদন্ত শুরু হয়েছে। কিছু ক্ষণের মধ্যে ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞেরা দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছোবেন বলে জানা গিয়েছে। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, পুরো ঘটনাটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং আশেপাশের সিসিটিভি ফুটেজ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে এটি দুর্ঘটনা নাকি অন্য কোনও কারণ রয়েছে, তা নিশ্চিত করতে তদন্ত চলছে।
এদিকে এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই শোকের আবহ নেমে আসে বাংলা চলচ্চিত্র জগতে। অনীক দত্তের সহকর্মী, অভিনেতা-অভিনেত্রী থেকে শুরু করে ইন্ডাস্ট্রির বিভিন্ন স্তরের মানুষ সামাজিক মাধ্যমে গভীর শোক প্রকাশ করতে থাকেন। অনেকেই ঘটনাটিকে অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও অবিশ্বাস্য বলে উল্লেখ করেন। তবে একইসঙ্গে সবাই অনুরোধ করেছেন, কোনওরকম নিশ্চিত তথ্য ছাড়া গুজব না ছড়াতে।
বাংলা সিনেমায় অনীক দত্ত ছিলেন এক স্বতন্ত্র নাম। মূলত বিজ্ঞাপনী দুনিয়া থেকে চলচ্চিত্রে এসে তিনি নিজের আলাদা ভাষা ও দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করেছিলেন। তাঁর প্রথম বড় সাফল্য আসে ২০১২ সালে ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ ছবির মাধ্যমে। এই ছবিটি শুধু বক্স অফিসেই সফল হয়নি, বরং সমালোচকদের কাছেও প্রশংসিত হয়েছিল। ব্যঙ্গ, হাস্যরস এবং সমাজ বিশ্লেষণের এক অনন্য মিশেলে ছবিটি দর্শকদের মন জয় করে নেয়।
এরপর একে একে তিনি নির্মাণ করেন ‘আশ্চর্য প্রদীপ’, ‘মেঘনাদবধ রহস্য’, ‘বরুণবাবুর বন্ধু’ এবং ‘অপরাজিত’-র মতো গুরুত্বপূর্ণ ছবি। বিশেষ করে ‘অপরাজিত’, যা সত্যজিৎ রায়ের জীবন ও চলচ্চিত্র ভাবনার প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি হিসেবে তৈরি, তা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। এই ছবির মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেন, বাংলা চলচ্চিত্রে এখনও পরীক্ষামূলক ও ভাবনাধর্মী নির্মাণের জায়গা রয়েছে। অনীক দত্তের ছবিগুলির বৈশিষ্ট্য ছিল সূক্ষ্ম ব্যঙ্গ, সামাজিক পর্যবেক্ষণ এবং মধ্যবিত্ত জীবনের বাস্তব চিত্রায়ণ। তিনি সবসময়ই মূলধারার বাইরে গিয়ে আলাদা ধরনের গল্প বলতে আগ্রহী ছিলেন। তাঁর কাজ নতুন প্রজন্মের দর্শকদেরও ভিন্নভাবে ভাবতে বাধ্য করেছে।
বর্তমানে তাঁর মৃত্যুর খবর নিয়ে যেমন শোকের আবহ তৈরি হয়েছে, তেমনই ঘটনার সত্যতা নিয়ে রয়ে গেছে একাধিক প্রশ্ন। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয় বলে জানিয়েছে প্রশাসন।




















